অগ্নিগর্ভ খাগড়াছড়ি, ধর্ষণকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে নিহত ৩

By নিজস্ব প্রতিবেদক, রাঙামাটি থেকে :

5 Min Read

পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়ি সদরের সিঙিনালায় এক মারমা কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পার্বত্য জনপদ। শনিবার ও রোববার (২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর) খাগড়াছড়ি সদর ও গুইমারায় অবরোধ, সংঘর্ষ, সাম্প্রদায়িক হামলা, অগ্নিসংযোগকে কেন্দ্র করে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এরমধ্যে স্যোশাল মিডিয়ায় গুজব, অপতথ্য ছড়ানোর অভিযোগ উঠছে।

এরমধ্যেই রোববার খাগড়াছড়িতে এক আইনশৃঙ্খলা সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা খাগড়াছড়ির ঘটনায় ‘তৃতীয় পক্ষের’ ইন্ধন খুঁজছেন।

একই সঙ্গে সব পক্ষকেই আশ্বাস দিয়েছেন মারমা কিশোরীকে ধর্ষণকারী, নারী নির্যাতনকারী ও অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকালে খাগড়াছড়ি জেলাপ্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় পার্বত্য উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে অপরাধ কখনোই প্রশ্রয় পাবে না। ধর্ষণকারী, নারী নির্যাতনকারী, অস্ত্রধারী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ভবিষ্যতে যেন পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনোভাবেই সাম্প্রদায়িক সংঘাত না ঘটে, সে বিষয়ে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

উপদেষ্টা৷ বলেছেন, আইনের ভিত্তিতেই প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের সমাজে অসহনশীলতা সৃষ্টি হোক, তা কখনোই কাম্য নয়। শিক্ষকদের প্রতি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, নিজেকে, নিজের সন্তানকে ও সমাজকে ঠিক করতে হবে। সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অভিভাবকদেরই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।

বক্তব্যে উপদেষ্টা বাঙালি-পাহাড়ি সকল সম্প্রদায়কে একত্রে কাজ করার আহ্বান জানান। এছাড়াও আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা ও প্রবারণা-পূর্ণিমা ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে সফল করতে সবাইকে সোচ্চার থাকার আহ্বান জানান তিনি।

সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক এবিএম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার। উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা, উপদেষ্টার একান্ত সচিব (উপসচিব) খন্দকার মুশফিকুর রহমান, খাগড়াছড়ি সদর জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. খাদেমুল ইসলাম, জেলা পুলিশ সুপার আরেফিন জুয়েল, ছাত্রনেতা-বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ।

শনিবার দিনভর খাগড়াছড়ি জেলায় অবরোধের মধ্যেই জেলা সদরের চেঙ্গি স্কয়ার, মহাজনপাড়া, উপজেলা পরিষদসহ জেলা শহরের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। এছাড়া পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থানে দুইপক্ষের ইট পাটকেল ছোঁড়ায় দুপক্ষেরই আহতের খবর ছড়িয়ে পড়ে। এরমধ্যেই খাগড়াছড়ি শহরের স্বনির্ভর বাজারে বাঙালিদের দোকানে ভাঙচুর আর লুটের অভিযোগ পাহাড়িদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে একটি মসজিদ ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লেও রোববার ফ্যাক্টচেকার প্রতিষ্ঠান দ্য ডিসেন্ট জানিয়েছে, এটি গুজব।

এদিকে, রোববার সকাল থেকেই খাগড়াছড়ি শহরের বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। শহরজুড়ে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর টহলের মধ্যেও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শনিবার থেকে খাগড়াছড়ি ও গুইমারায় প্রশাসনের ১৪৪ ধারা জারির মধ্যেই রোববার দুপুর আনুমানিক ১টার দিকে গুইমারায় ‘রামেসু বাজারে’ অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বাজারে পাহাড়ি-বাঙালিদের বেশ কয়েকটি দোকানপাট পুড়ে গেছে; এরুই মধ্যে বেশিরভাগই পাহাড়িদের বলে জানা যাচ্ছে।

- Advertisement -

খাগড়াছড়ি সদরের সিঙিনালা থেলে শুরু হওয়া ধর্ষণ ও নারীনিপীড়নবিরোধী আন্দোলনের প্লাটফর্ম ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’র ফেসবুক পেজে এক বার্তায় রোববার দুপুরে জানানো হয়েছে, ২৮ সেপ্টেম্বর হতে খাগড়াছড়িতে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করা হচ্ছে। কিন্তু খাগড়াছড়িজুড়ে বিশেষ করে পানছড়ি সড়ক ও দীঘিনায় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ব্যাপক ঘরবাড়ি তল্লাশি, মারধর ও ধরপাকড়ের অভিযোগ তুলেছে তারা। বার্তায় আরও জানায়, একই সঙ্গে গুইমারায় পরিকল্পিতভাবে দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালাচ্ছে, নিরীহ ও নিরস্ত্র শিশু, নারী ও পুরুষদের ওপর গুলি বর্ষণ করছে, যা এখনো চলমান। যদিও এ ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কিনা- এ সংক্রান্ত কিছুই জানায়নি তারা।

এদিকে, খাগড়াছড়ির গুইমারায় রোববারের ঘটনায় হতাহতের বিষয়ে জানতে খাগড়াছড়ি জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের জানান, আজকে খাগড়াছড়ি হাসপাতালে আহত চিকিৎসাধীন এসেছেন ৪ জন। আর ৩ জনের মরদেহ আনা হয়েছে, সেগুলো সম্ভবত গুইমারা থেকেই। নিহতদের ময়নাতদন্ত করা হবে।

রাঙামাটিতেও বিশেষ আইনশৃঙ্খলা বৈঠক:

- Advertisement -

এদিকে, খাগড়াছড়ি জেলার বিদ্যমান উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে রাঙামাটি বিশেষ আইনশৃঙ্খলা বৈঠক করেছে জেলা প্রশাসন। রোববার বিকালে রাঙামাটি জেলাপ্রশাসক কার্যালয়ে জেলাপ্রশাসক মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহের কক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে জেলাপ্রশাসক মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহর সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন- রাঙামাটির পুলিশ সুপার ড. এসএম ফরহাদ হোসেন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জোবাইদা আক্তার, কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক দীপেন দেওয়ান, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির রাঙামাটি জেলা কমিটির সভাপতি গঙ্গামানিক চাকমা, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদ, এনসিপির জেলার যুগ্ম সমন্বয়কারী উজ্জ্বল চাকমা, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি নির্মল বড়ুয়া মিলন, জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মো. জাহাঙ্গীর, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্য নিরূপা দেওয়ান প্রমুখ।

এর আগে, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির দীঘিনালার বোয়ালখালী বাজারে স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যে উত্তেজনা, সংঘর্ষের জের ধরে পাশের জেলা রাঙামাটিতেও সাম্প্রদায়িক হামলা, সংঘর্ষ ও নিহতের ঘটনা ঘটে। ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর দুদিনে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায় ৪ জন নিহত হন, যারা সকলেই ছিলেন পাহাড়ি। এছাড়াও পাহাড়িদের দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ কার্যালয়ে ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। সেই বিভীষিকাসময় ঘটনার এক বছরের মাথাও আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠল সবুজ পাহাড়ের পার্বত্য জনপদ।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *