আধুনিকতার ছোয়ায় বিলুপ্তির পথে বাংলার ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি। তবে ব্যতিক্রমী চিন্তা ও উদ্যোগে এই শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন পিরোজপুরের সজল দে। শীতলপাটি দিয়েই তৈরি করছেন শো-পিস থেকে শুরু করে নানা গৃহস্থালি পণ্য। কর্মসংস্থানের পাশাপাশি তৈরি করছেন স্বপ্ন।
শুভ্র-স্নিগ্ধ এক টুকরো ঠান্ডা শৈশবের স্মৃতি শীতলপাটি। একসময় বিয়ের আসর থেকে শুরু করে ঘর সাজানোর অভিজাত অনুষঙ্গ ছিল এই পাটি। এখন সেই ঐতিহ্য হারাতে বসেছে আধুনিক জীবনের চাপে।
কিন্তু এই বিলুপ্তির পথে হাঁটতে থাকা ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে কাজ করে চলেছেন এক ব্যতিক্রমী কারিগর, পিরোজপুর জেলার কাউখালী উপজেলার সজল দে। পিতার হাত ধরে শেখা শীতলপাটি তৈরির এই শিল্পটিকে তিনি শুধু বাঁচিয়ে রাখেননি, দিয়েছেন আধুনিকতা আর সৃজনশীলতার নতুন ছোঁয়া।
হারিয়ে যেতে বসেছে শীতলপাটি শিল্প
একসময় বাংলার ঘরে ঘরে চলত শীতলপাটি বোনার কাজ। মাটির ঘরে, খড়ের চালার নিচে, হরহামেশা দেখা যেত নারীদের মুরতা বেত কাটতে, শুকাতে, রঙে রাঙাতে আর সেই বেত দিয়ে তৈরি হত কারুকার্যময় পাটি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে, প্লাস্টিকের মাদুর ও রেক্সিনের দাপটে সেই শিল্প হারাতে বসেছে।
২০১৭ সালে ইউনেস্কো বাংলাদেশের শীতলপাটি শিল্পকে “বিশ্ব ঐতিহ্য” হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও বাস্তবে শিল্পীরা পাননি কাঙ্খিত মূল্য বা পৃষ্ঠপোষকতা।
শিল্পীরা জানান, একটি মাঝারি সাইজের (চার হাত বাই পাঁচ হাত) শীতলপাটি তৈরিতে লাগে অন্তত ১৬০টি মুরতা বেত। একসময় যেগুলোর দাম ছিল ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা, এখন তা ১২০০-১৫০০ টাকায় কিনতে হয়। অথচ পাটির বিক্রয় মূল্য সেই তুলনায় ন্যায্য হয় না। ফলে অনেকেই বাপ-দাদার এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার এখনও কোনোভাবে টিকে আছেন, তাদেরই একজন সজল দে।
শীতলপাটি দিয়ে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত
সজল দে যখন দেখলেন পাটির ব্যবহার দিনে দিনে কমে যাচ্ছে, তখন থেমে থাকেননি। বরং শীতলপাটি দিয়েই নতুন ধরনের গৃহস্থালি পণ্য ও শো-পিস তৈরি শুরু করেন। তিনি এখন পাটি দিয়ে তৈরি করছেন পাখির বাসা, টিস্যু বক্স, পেন্সিল বক্স, ল্যাম্প শেড, ডাইনিং ম্যাট, স্যুটকেস, ব্যাগ, কলমদানি, ওয়ালম্যাট, শো-পিস ও কার্পেট সহ প্রায় ৫০ ধরনের শীতলপাটির সামগ্রী। এই পণ্যগুলো দেশের বিভিন্ন মেলায় বিক্রি করছেন সজল এবং পাচ্ছেন ভালো সাড়া। দেশীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকেও আগ্রহ পাচ্ছেন তিনি।
শীতলপাটির শিক্ষায় নারী স্বাবলম্বীতা
শুধু নিজের জন্যই নয়, সজল দে উদ্যোগ নিয়েছেন অন্যদের স্বাবলম্বী করে তোলার। ইতোমধ্যে তিনি প্রায় ২০ জন নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীরা নিজেরাও এখন পাটি দিয়ে পণ্য তৈরি করে আয় করছেন, নিজ নিজ পরিবারে আর্থিকভাবে অবদান রাখছেন।
শুক্লা দে, একজন শিক্ষার্থী, পড়ালেখার খরচ চালাচ্ছেন শীতলপাটির আসবাবপত্র তৈরি পণ্য বিক্রি করে।
আরেকজন প্রশিক্ষণার্থী কৃষ্ণা হালদার বলেন, “আমি এখন সংসারের পাশাপাশি শীতল পাটির শো-পিস তৈরি করে বাড়তি আয় করছি।”
সরকারি সহযোগিতা ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন
সজল দের এই উদ্যোগে সহযোগিতা করছে কাউখালী উপজেলা প্রশাসন ও এসএমই ফাউন্ডেশন। কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সজল মোল্লা বলেন, “সজল দে শীতল পাটির আধুনিক রূপ দিয়ে অনেককে কর্মসংস্থান দিয়েছেন। তার এই উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানিয়ে সার্বিক সহযোগিতা করছি।”
সজল দের স্বপ্ন এখন আরও বড়। তিনি চান ভবিষ্যতে “শীতলপাটি মিউজিয়াম” তৈরি করতে, যেখানে এই শিল্পের ঐতিহ্য এবং পাটি দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পণ্য প্রদর্শিত হবে।
আধুনিকতার চাপে বিলুপ্তপ্রায় এক ঐতিহ্য যখন হারিয়ে যাওয়ার মুখে, তখন সজল দের মতো কারিগরেরা যেন আশার আলো। আদি ঐতিহ্য ধরে রেখে নতুন চিন্তাা আর সৃজনশীলতার মাধ্যমে কীভাবে একটি পেশাকে নতুন রূপ দেওয়া যায়, সজল দে তার জীবন্ত প্রমাণ।
শুধু একটি পেশা নয়, বরং পুরো একটি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সমাজে কর্মসংস্থানের গল্প এখন শীতলপাটির বুননে গাঁথা।

