একজন সন্তোষ হালদার, এসময়ও রেডিও যার সারাক্ষণ সাথি

4 Min Read

শিবু সাওজাল, মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি :

একজন অবসরপ্রাপ্ত বিজ্ঞানের শিক্ষক সন্তোষ হালদার। এসময়ও যার সময় কাটে রেডিওকে সাথে নিয়ে। বহু বছর আগের কথাা দেশে এবং দেশের বাইরে বিনোদন ও সকল খবরাখবর নিয়মিত যানার মাধ্যম ছিল রেডিও। আধুনিক প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির কারণে সে রেডিও এখন অতিত। অন্যদিকে তিরাশী বছরের শিক্ষক সন্তোষ কুমার হালদারের দিনের সিংহ ভাগ সময় কাটে ন্যাশনাল প্যানাসনিক রেডিওটি নিয়ে। মঠবাড়িয়ার পূর্ব সেনের টিকিকাটার হাওলাদার বাড়ির একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের মর্যাদায় সামাজিকভাবে গ্রহণ যোগ্যতা নিয়ে এখনো সময় পাড় করছেন।

১৪ মার্চ শুক্রবার বেলা তখন বারটা ত্রিশ, অনুমতি নিয়ে তাঁর ঘড়ে ঢুকতেই চোখে পড়লো সন্তোষ স্যার নিজ চেয়ারে বসে যথা নিয়মে কানের কাছে রেডিওটি নিয়ে আকাশ বাণী সেন্টার খুঁজছে। তাঁর আমাকে চোখে পড়তেই ক্ষীণ স্বরে বসার জন্য বললেন। আমি বসলাম এবং কথা বলার অনুমতি চাইলাম। অনুমতি মিলল, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার সামনে এত বড় স্ক্রিনর একটা টেলিভিশন থাকতেও আপনার রেডিও নিয়ে সময় কাটে কেন?

সন্তোষ কুমার বললেন, আমি ষাটের দশক থেকে সেই যে রেডিও শুনে শুনে অভ্যস্থ আজও তার আবেদন আমার কাছে বেশি পছন্দের। ছোট বেলা থেকে দেখে আসছি আমার বাবা দীন নাথ হালদার হলল্যান্ড ফিলিপসের নব ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে শ্রুতি মধুর গান, নাটক সংবাদ শুনতেন, আমরা ছোটরা সবাই লুকিয়ে লুকিয়ে মনভরে শুনতাম। বিবিসি,ভয়েস অব আমেরিকা,আকাশ বানী কলকাতা বেতারের নানান রকম অনুষ্ঠান শুনতাম। বিবিসি,ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদের পাশাপাশি শিক্ষা মূলক অনুষ্ঠান শুনে শুনে আমরা অনেকাংশে সমৃদ্ধ হয়েছি। এখনো আমার ঘুম ভাঙে রবীন্দ্র সংগীতের প্রভাতী অনুষ্ঠান শুনতে শুনতে।আমার বিছানার মাথার কাছে রেডিও না নিয়ে ঘুমলে ঘুম আসেনা।

রেডিওতে এখনো অনুরোধের আসর, পুড়ানো নাটক, প্রতিদিনের সংবাদ না শুনলে কি যেনো অভাব থেকে যায়। আমি এই বয়সে কোথাও বেড়াতে অথবা চিকিৎসার জন্য গেলেও রেডিওটি আমার সাথে থাকা চাই। এ আমাকে প্রাণবন্ত রাখতে পরম বান্ধবের ভূমিকা পালন করে। ছাপানো সংবাদপত্র পাঠের মত একটি ভিন্ন স্বাদ রেডিওতে খুঁজে পাই। আমি ভিন্ন একটি উদাহরণ সবার উদ্দেশ্যে দিতে চাই। আমার ছেলের ঘরের একমাত্র নাতি জিজু এবার ক্যাডেটে ভর্ত্তি হবার সুযোগ লাভ করেছে,মনে করি সেখানে আমার রেডিওটির একটি অবদান আছে।

আমি আনেক কিছু শুনে শুনে যেমন সমৃদ্ধ হয়েছি তেমনি আমার নাতিকেও সমৃদ্ধ করার ফলে তার উন্নত ফলাফল পেয়েছি। অবসর জীবনে আমার রেডিওটি আমার একান্ত সঙ্গি হিসেবে বেছে নিয়েছে। টেলিভিশন দেখতে দেখতে চোখ ধরে যায় আর আমার রেডিওতে এখনো যখন শাওলী মিত্র শম্ভু মিত্রের ধারণকৃত পুড়ানো নাটক শুনি তখন মন ভরে যায়। সন্তোষ কুমার হালদার ১৯৬৮ সালের মার্চ মাসে দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খাস মহল লতীফ ইনস্টিটিউশনে বিজ্ঞান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন।

গুনী ও অভিজ্ঞ শিক্ষক হিসাবে নিজেকে প্রমানের পর ১৯৬৯ এ জুলাই মাসে হাতেম আলী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। এরপর একজন অভিজ্ঞ সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক হিসাবে সুনামের সাথে ২০০৫ সালে উল্লেখিত বিদ্যালয় থেক অবসর গ্রহণ করেন। স্যারের সাথে কথা বলে মনে হল, কিছুই পুরনো নয় সব কিছুরই আবেদন আছে। তবে ভিন্নতাও আছে। সরেজমিনে বেশ কয়েক জনের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, আমাদের এলাকার কোন ঘরেই এখন রেডিও নেই। যাদের বয়স এখন কুড়ি বছর তাদের কাছে রেডিওর কথা জিজ্ঞাস করলে নব্বই ভাগই রেডিও দেখেছে বলে বলতে পারবেনা। বিজ্ঞান শিক্ষক সন্তোষ কুমার হালদার তার দিনকাটে প্রভাত বেলা থেকে শুরু করে রাত দশটা অবধি গানের সুর, নাটকের সংলাপ আর প্রতিদিনের সংবাদ শুনে।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *