খুলনার নদ-নদী থেকে গত এক বছরে অর্ধশতাধিক মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে ভয় এবং অস্থিরতার সৃষ্টি করছে। নদীর বুক থেকে উদ্ধার হওয়া প্রতিটি নিথর দেহ শহরের মানুষকে উদ্বিগ্ন করেছে।
নৌ-পুলিশ জানায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৫০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টির পরিচয় শনাক্ত হলেও ২০টি অজ্ঞাত। গত বছরের আগস্টে ৫টি, সেপ্টেম্বর ৪টি, অক্টোবর ১টি, নভেম্বর ৩টি এবং ডিসেম্বর ২টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ৭টি মরদেহের সবগুলোই শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এপ্রিলে ৩টির মধ্যে ২টির, মে মাসে ৬টির মধ্যে ৪টির, জুনে ৬টির মধ্যে ২টির, জুলাইয়ে ৩টির মধ্যে ১টির এবং আগস্টে ৮টির মধ্যে ৩টির পরিচয় মেলেনি।
মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) খুলনা শিপইয়ার্ড ১ নম্বর জেটির পাশে নদীর তীরে ভাসমান এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে নিহত ব্যক্তির পরিচয় এখনো জানা যায়নি। লবণচরা থানার ওসি হাওলাদার সানোয়ার মাসুম জানান, মরদেহ উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ জানায়, নদীতে দীর্ঘ সময় থাকায় অধিকাংশ মরদেহ পচে গেছে, আঙুলের টিস্যু পর্যন্ত নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা অন্যান্য শনাক্তকরণ পদ্ধতি কার্যকর হচ্ছে না। পরিচয় নির্ণয়ের জন্য সিআইডি ও পিবিআই ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠাচ্ছে। নাম-পরিচয় জানা না গেলে মরদেহগুলো ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে দাফন করা হচ্ছে।
নৌ-পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর ও সাতক্ষীরা জেলার নদ-নদী থেকে এসব লাশ উদ্ধার হয়েছে। খুলনার ভৈরব, রূপসা, কাজিবাছা, আঠারবেঁকী ও শিবসা নদী; বাগেরহাটের পশুর ও শ্যালা নদী; পিরোজপুরের সন্ধ্যা, কচা ও বলেশ্বর নদী এবং সাতক্ষীরার নওবেঁকীসহ একাধিক নদী এসব ঘটনায় অন্তর্ভুক্ত।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া ৫০টি লাশের মধ্যে ৩২ জন পুরুষ, ৭ জন নারী এবং ১১ জন শিশু। উদ্ধার অঞ্চল অনুযায়ী, রূপসা নদী থেকে ৪০%, ভৈরব নদী থেকে ৩০%, পশুর নদী থেকে ২০% এবং অন্যান্য নদী থেকে ১০% লাশ পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীতে লাশ ফেলার প্রবণতা কমাতে নৌ-পুলিশের টহল জোরদার করা, নদীপথে নজরদারি বাড়ানো এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। এছাড়া স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শক্তিশালী করা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
খুলনা নৌপুলিশ সুপার ডা. মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, নদীতে লাশ ফেলা অপরাধীদের কাছে নিরাপদ কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলা হয়। নদীতে দীর্ঘ সময় থাকার কারণে চেহারা বিকৃত হয়, শরীরের টিস্যু নষ্ট হয় এবং শনাক্তকরণ কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বর্তমানে মূলমাত্রা হিসেবে শুধুমাত্র ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নির্ধারণ করা সম্ভব।

