খেলাপি ঋণে গভীর সংকটে ব্যাংক খাত

By বিশেষ প্রতিনিধি :

3 Min Read

দেশের ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণের বোঝায় জর্জরিত। আনুষ্ঠানিক হিসাবে খেলাপি ঋণ দেখানো হচ্ছে ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশে গোপন রয়েছে আরও ১ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। প্রকৃতপক্ষে খেলাপি ঋণের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকায়। আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতারা বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণকে নিয়মিত হিসেবে দেখিয়ে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ১,০৮৬ জন ঋণগ্রহীতার ২৭ হাজারের বেশি হিসাবের আওতায় প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত দেখানো হচ্ছে। ফলে তারা খেলাপি হয়েও নতুন ঋণ নেয়া, এলসি খোলা কিংবা ব্যাংক পরিচালকের পদে থাকা, সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন।

ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, ছয় মাস ঋণ পরিশোধ না করলে তা খেলাপি হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা। কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে এ নিয়ম কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এভাবে অনাদায়ী ঋণ লুকিয়ে রাখাই ব্যাংক খাতের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বেশির ভাগ ঋণগ্রহীতা ইচ্ছাকৃত খেলাপি, যাদের অনেকেই বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখার সুযোগ নিয়ে খেলাপিরা দায় এড়াচ্ছেন। তিনি মনে করেন, খেলাপি ঋণ ট্রাইব্যুনাল বা সুপ্রিম কোর্টে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরও মনে করেন, স্থগিতাদেশ নিলেও ঋণগ্রহীতাকে খেলাপি হিসেবেই দেখানো উচিত। তার ভাষায়, খেলাপিকে খেলাপিই বলা উচিত। এজন্য সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিচার বিভাগকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

পরিসংখ্যান বলছে, মাত্র এক বছরে দৃশ্যমান খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩ সালের জুনে যেখানে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা, ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায়। অথচ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার কোটি টাকা।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, এখন আর আগের মতো সহজে স্থগিতাদেশ মেলে না। আদালত ডাউনপেমেন্টের শর্ত দিচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করছে, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বেঞ্চ ভাগ করা হচ্ছে। তিনি মনে করেন, স্থগিতাদেশ নিতে হলে কমপক্ষে ১০ শতাংশ বকেয়া পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা উচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, আগের সরকার খেলাপিদের জন্য নানা ছাড় দিলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখন কঠোরতা বাড়ানো হয়েছে। অনেক প্রভাবশালী খেলাপির সম্পত্তি নিলামে তোলা হচ্ছে, লভ্যাংশ বিতরণে কঠোর প্রভিশন নীতি মানতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে বিদেশে সম্পত্তি ফ্রিজ করার জন্য আবেদনও করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি কঠোর নজরদারি, দ্রুত বিচার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা একসঙ্গে কার্যকর করা যায়, তবে খেলাপি ঋণের এই দুষ্টচক্র ভাঙা সম্ভব হবে।

- Advertisement -
newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *