ডেঙ্গু জ্বরে মৃত্যুর সংখ্যা যেভাবে দিনদিন বাড়ছে, তা সকলকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, ডেঙ্গু এখন ভয়াবহ এক জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে যা কোনোভাবেই অমূলক নয়।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় এডিস মশাবাহিত এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতিদিন হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, চিকিৎসকদের ওপর তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ।
পর্যাপ্ত বেড, ওষুধ ও রক্তের সংকটে রোগী ও স্বজনদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ সেপ্টেম্বরের আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে যা এ বছরের এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। একই সময়ে ৭৪০ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, এটিও এক দিনে সর্বোচ্চ। এ নিয়ে চলতি বছর মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭৯ জনে এবং আক্রান্তের সংখ্যা ৪১ হাজার ৮৩১ জনে।
একসময় ডেঙ্গু কেবল ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল, কিন্তু এখন তা উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে অবস্থা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। আমাদের মতে, পরিবর্তিত বাস্তবতায় ডেঙ্গু মোকাবিলায় নতুন কৌশল ও স্থায়ী উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে শনাক্ত হওয়ার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। তাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
ডেঙ্গু পরীক্ষাকে ভর্তুকিমূল্যে সহজলভ্য করা এবং সময়মতো চিকিৎসা দেওয়াই মৃত্যুহার কমানোর মূল শর্ত। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পর্যায়েও নিয়মিত মশা নিধন ও সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।
২০২৪ সালের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, সারা দেশে ওই বছর ডেঙ্গুতে ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখেরও বেশি মানুষ। অথচ তার আগের বছর (২০২৩) মৃত্যু হয়েছিল ১ হাজার ৭০৫ জন এবং আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি।
এত ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও এবার প্রতিরোধে যথাযথ উদ্যোগ না নেওয়া সত্যিই বিস্ময়কর।
কেন এ বছর সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার হঠাৎ বেড়ে গেল, তা নিয়ে বিশেষ গবেষণাও প্রয়োজন। আমরা মনে করি, রাষ্ট্র ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। কেবল নামমাত্র প্রচার নয়, ঘরে ঘরে গিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। ব্যবহৃত কীটনাশক কার্যকর কিনা, সেটি বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে নিশ্চিত করতে হবে। তবে কেবল সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যাবে নাপ্রত্যেক পরিবারকেও দায়িত্ব নিতে হবে।
প্রতি সপ্তাহে অন্তত একদিন ঘরবাড়ি ও আশপাশে কোথাও পানি জমে আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে। ফুলের টব, ফ্রিজের ট্রে বা এয়ার কন্ডিশনের নিচের পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। পরিস্থিতি প্রমাণ করছে, ডেঙ্গু এখন শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং জাতীয় সংকট।
তাই সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণ সবাইকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। বছরব্যাপী মশক নিধন কর্মসূচি, জনসম্পৃক্ততা এবং শক্তিশালী চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই সংকট মোকাবিলার একমাত্র পথ।
অবহেলা করলে সামনে আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। মানুষের জীবন রক্ষার চেয়ে বড় দায়িত্ব রাষ্ট্রের আর কিছুই হতে পারে না।
