দূর্যোগ-নিষেধাজ্ঞায় কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পেয়ে দিশেহারা নদীপাড়ের মানুষ

By মাহমুদ হাসান রাজিব, রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী):

5 Min Read

মা ইলিশের নিরাপদ বিচরণ ও অভিপ্রয়াণের মাধ্যমে প্রধান প্রজনন সংরক্ষনে আজ ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ২২ দিন ইলিশসহ সকল প্রকারের মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। এ সময়ে নদী ও সাগরে ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।

এবার বৈরী আবহাওয়ার কারণে অধিকাংশ সময় জেলেদের ঘাটে বসে থাকতে হয়েছে। গভীর সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে ট্রলার ডুবির ঘটনাও ঘটেছে অনেক। এতে জেলে নিখোঁজ ও মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে আবারও ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা তাদের পেশায় নতুন দুর্ভোগ ডেকে আনছে। এক টানা দুর্যোগ ও নিষেধাজ্ঞার কারনে সংকটে জেলেরা। কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পেয়ে ঋণের বোঝা পরিশোধ করতে পারেনি অনেকে।

উপকূলীয় এলাকার জেলেদের প্রধান ও একমাত্র জীবিকা মাছ ধরা। বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান না থাকায় নিষেধাজ্ঞার সময় তারা কার্যত বেকার হয়ে পড়েন। পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণ চালাতে গিয়ে অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় বিগত দিনে সরকারি বিধি উপেক্ষা করার নজিরও রয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা চলাকালে নিবন্ধিত জেলে পরিবারগুলোকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার সরকারি ঘোষণা থাকলেও জেলেরা বলছেন, এ চাল একটি পরিবারের জন্য যথেষ্ট নয়। অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মের কারণে সবাই সহায়তা পান না। ফলে পরিবার-পরিজনের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামাল দিতে গিয়ে জেলেদের আরও অসহায় হতে হচ্ছে।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে পটুয়াখালীতে ৭৬ হাজার ৭১১ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছে। যা ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে প্রায় ১৫ শতাংশ কম উৎপাদন হয়। তবে সংশ্লিষ্টরা বলেছে, এ চলতি বছরে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে রাঙ্গাবালী উপজেলার নিবন্ধিত ১৬ হাজার ৮০৯ জন জেলের মধ্যে ১৩ হাজার জেলে পরিবারকে মানবিক সহায়তার কর্মসূচির আওতায় ভিজিএফ’র ২৫ কেজি করে চাল দেয়া হবে। তবে জেলেরা বলছে এ সহায়তা অপ্রতুল।

কোড়ালিয়া মৎস্য ঘাটের সুজন মাঝী (২৭) বলেন, ২২ দিন সাগরে যেতে পারব না। এ সময় সংসার চালানো কষ্ট হয়ে যায়। ২৫ কেজি চাল দিয়ে তো পুরো মাস সংসার চলে না। চালের পাশাপাশি কিছু নগদ টাকা দিলে আমরা অন্তত বাজার-সদাই করতে পারতাম।”

রাঙ্গাবালীর সামুদাবাদ মৎস্যঘাট এলাকার জেলে পরিবারের গৃহবধূ ফরিদা বেগম (৪০) বলেন, একদিন মাছ না ধরলে চুলায় আগুন জ্বলে না। ছেলে মেয়ের লেখাপড়া খরচ জোগাতে কষ্ট হয় তারমধ্যে ধারদেনা টাকা পরিশোধ করতে পারিনি।

একই এলাকার মৎস্য জেলে সত্তার মিয়া (৪৫) জানালেন, আমরা মা ইলিশ রক্ষার নিয়ম মানতে রাজি। সরকার যদি পর্যাপ্ত সহায়তা না দেয়, তাহলে অনেকেই বাধ্য হয়ে লুকিয়ে মাছ ধরে। এতে মা ইলিশ রক্ষা করা কঠিন হয়ে যায়। ছাড়াও দুর্যোগের সময় ট্রলার ডুবিতে যেসকল জেলেরা নিখোঁজ ও মৃত হয়েছে তাদের পরিবারদের নগদ অর্থ সহায়তা করলে অনেক ভালো হয়।

রাঙ্গাবালী উপজেলা মৎস্য দপ্তরের মেরিন ফিশারিজ অফিসার এস এম শাহাদাত হোসেন রাজু বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে রাঙ্গাবালী উপজেলা মৎস্য দপ্তর ও টাস্কফোর্স। এ সময় সচেতনতামূলক প্রচার চালিয়েছে উপজেলা মৎস্য দপ্তর । উপজেলার মৎস্য আড়ত, মাছ বাজার, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, বিভিন্ন জনসম্মুখ এলাকায় মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, ব্যানার টানানো হয়েছে।অভিযানের সময় জলসীমার বাইরে মাছ ধরা ট্রলারের অনুপ্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

- Advertisement -

শেরে-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, “বাংলাদেশের জেলেরা বহুমুখী ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। অনেক জেলের নিবন্ধন কার্ড নেই, ফলে মা ইলিশ বা জাটকা রক্ষার সময়ে সরকার প্রদত্ত প্রণোদনা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যেও অনেকে সহায়তা পান না। অন্যদিকে, ঘূর্ণিঝড় কিংবা অন্যান্য দুর্যোগে জেলেরা নিখোঁজ হলেও মৎস্য ঘাট থেকে সাগরে যাওয়া ও ফেরা সম্পর্কিত কোনো সরকারি হিসাব না থাকায় পরবর্তীতে পরিবারগুলো সরকারি প্রণোদনা থেকেও বঞ্চিত হন।

অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী আরো বলেন, সকল জেলেকে অবরোধকালে প্রণোদনার আওতায় আনা জরুরি। পাশাপাশি মৎস্য বন্দরে সরকারিভাবে নৌকার নিবন্ধন এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা উচিত, যাতে প্রতিটি জেলের সনাক্তকরণ, সাগরে যাত্রা ও ফেরার তথ্য সরকারি নথিভুক্ত থাকে। এতে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটলে পরিবারগুলো ক্ষতিপূরণ পাবে এবং উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা যাবে। একইসঙ্গে জেলেদের জন্য ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম (যেমন লাইফ জ্যাকেট, সিগন্যাল লাইট ইত্যাদি) বহন ও ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং এর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *