ভবনের চূড়ায় ঝুলছে বিশাল বিশাল ব্যানার, দেয়ালজুড়ে পোস্টার যেন কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রচারণা। এমন দৃশ্য শনিবার দেখা গেল মিরপুরের শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে। তবে এটি কোনো রাজনৈতিক নির্বাচন নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচন।
নাজমুল হাসান পাপনের সময়েও এমন সাজসজ্জা দেখা যেত চটকদার ব্যানার, স্লোগান, প্রচারণা। তখনও নির্বাচনের আবহ ছিল সাজানো, লড়াই হতো কেবল দু-একটি পদে। সময় বদলেছে, কিন্তু পদ্ধতি নয়। নাজমুল ও তার ঘনিষ্ঠরা এখন প্রান্তে, কিন্তু তাদের ছায়া এখনো বিসিবির ভেতরে বিদ্যমান। আবারও সেই পুরোনো চিত্রনাট্যের পুনরাবৃত্তি পেছনে নির্ধারিত ছক, সামনে সাজানো নির্বাচনের দৃশ্যায়ন। পার্থক্য শুধু কুশীলবের।
রাজধানীর এক হোটেলে সোমবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। তিনটি ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত হবেন ২৩ পরিচালক, আরও দুইজন আসবেন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মনোনয়নে। ফলাফল জানানো হবে সন্ধ্যা ৬টায়, আর পরিচালকদের ভোটেই সেদিনই নির্বাচিত হবেন সভাপতি ও সহ-সভাপতি।
তবে এবারের নির্বাচন ঘিরে উৎসব নয়, বিতর্কই বেশি। সরে দাঁড়িয়েছেন ২১ জন প্রার্থী, যার মধ্যে রয়েছেন তামিম ইকবালসহ বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট। শেষ মুহূর্তে, এমনকি রাত ২টার পরও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন ক্লাব ক্যাটেগরির প্রার্থী মোহাম্মদ ফায়জুর রহমান ভূঞা।
এরই মধ্যে ৯ জন পরিচালক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। বাকি পদগুলোতেও তেমন প্রতিযোগিতা নেই। কেবল ৩ নম্বর ক্যাটাগরিতে (সাবেক ক্রিকেটার, বিশ্ববিদ্যালয় ও সংস্থা) খালেদ মাসুদ পাইলট ও দেবব্রত পালের লড়াই- ই সামান্য আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
অন্যদিকে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি হতে যাচ্ছেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। চার মাস আগে ফারুক আহমেদের স্থলাভিষিক্ত হয়ে তিনি বলেছিলেন, এটি তার “সংক্ষিপ্ত ইনিংস”। কিন্তু এখন তিনি দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব নিতে আগ্রহী। তার এই অবস্থান নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ছায়া ভূমিকা নিয়ে।
অভিযোগ উঠেছে, উপদেষ্টা আড়াল থেকে পুরো নির্বাচনী সমীকরণ সাজাচ্ছেন। ফারুক আহমেদকে সরাতে যেমন ভূমিকা রেখেছিলেন, এখন তাকেই নির্বাচনী সমঝোতার অংশ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তামিম ইকবালের সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়েও নেপথ্যে ছিল নানা নাটকীয়তা। সরকারের একটি অংশ নির্বাচনকে প্রভাবিত করছে এমন অভিযোগ তোলেন তামিম নিজেই। মনোনয়ন প্রত্যাহারের পর তিনি বলেন, আপনারা জিততে পারেন, হারতেও পারেন, কিন্তু আজ ক্রিকেট হেরে গেল। নির্বাচনের ফিক্সিং বন্ধ না করলে মাঠের ফিক্সিং বন্ধ করা যাবে না।
ইসরাফিল খসরুও অভিযোগ করেন, নির্বাচনে নগ্ন হস্তক্ষেপ চলছে। সরকারের একটি গোষ্ঠী পুরো প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
এরপর একে একে সরে দাঁড়ান লুৎফর রহমান বাদল, হাসিবুল আলম, মেজর (অব.) ইমরোজ আহমেদ ও এসএম আব্দুল্লাহ আল ফুয়াদ রেদুয়ান। তাদের অভিযোগ, নির্বাচন “প্রহসনে” পরিণত হয়েছে।
রোববারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শুক্রবার রাতেই ঢাকার একটি হোটেলে বসে ক্লাব ক্যাটেগরির ১২ পরিচালক চূড়ান্ত করে ফেলা হয় অর্থাৎ ভোটের আগেই “রাতের ভোট” সম্পন্ন।
কাঁঠালবাগান গ্রীন ক্রিসেন্ট ক্লাবের কাউন্সিলর মেজর (অব.) ইমরোজ আহমেদ বলেন, সব কিছু আগে থেকেই সেট-আপ করা।
সবশেষ রোববার রাত ২টার পর ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের কাউন্সিলর মোহাম্মদ ফায়জুর রহমান ভূঞাও প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। তার ভাষায়, সুস্থ নির্বাচনী পরিবেশ নেই, তাই এই প্রহসনে অংশ নিচ্ছি না।
ক্লাব ক্যাটেগরিতে আগে ৩০ জন প্রার্থী থাকলেও শেষ পর্যন্ত বাকি আছেন ১৫ জন—এর মধ্যে ১২ জন হবেন পরিচালক। অর্থাৎ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই বললেই চলে।
অতএব, প্রশ্ন উঠছে এটি কি নির্বাচন, না কি আগেই আঁকা ছবির আনুষ্ঠানিক উন্মোচন?
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ভোটার বলেন, নাজমুল হাসানের আমলে যেমন নির্বাচন ছিল আনুষ্ঠানিকতা, তেমনই এবারও মনে হচ্ছে, বিসিবির নতুন নির্বাচন কেবল দৃশ্যপট পাল্টানো পুরোনো নাটকের পুনঃমঞ্চায়ন।
