বিশ্বসাহিত্যে জাদুবাস্তবতার এক অনন্য জগৎ নির্মাণ করেছিলেন কলম্বিয়ার কিংবদন্তি লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। পাঠকের কাছে যিনি বেশি পরিচিত ‘গ্যাবো’ নামে। তাঁর সৃষ্ট সাহিত্যজগৎ বাস্তবতা ও অলৌকিকতার এক বিস্ময়কর মিশেল, যা লাতিন আমেরিকার সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসকে নতুন এক ভাষা দিয়েছে। জন্মদিনে তাই নতুন করে স্মরণ করা এই নোবেলজয়ী কথাসাহিত্যিককে।
১৯২৭ সালের ৬ মার্চ কলম্বিয়ার আরাকাতাকা শহরে জন্ম নেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। শৈশবে তিনি বড় হন নানা-নানীর কাছে। তাঁর নানী ছিলেন অসাধারণ গল্পবলিয়ে; ভূত-প্রেত, অলৌকিক ঘটনা কিংবা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা তিনি এমনভাবে বর্ণনা করতেন যেন সেগুলো বাস্তব। এই গল্প বলার ভঙ্গিই পরবর্তীতে মার্কেজের সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
পরবর্তীতে সাংবাদিকতা দিয়ে লেখালেখির পথ শুরু করলেও মার্কেজ বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পান তাঁর উপন্যাস ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’–এর মাধ্যমে। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসে মাকোন্দো নামের কাল্পনিক শহর ও বুয়েন্দিয়া পরিবারের একশ বছরের ইতিহাসের ভেতর দিয়ে তিনি তুলে ধরেন নিঃসঙ্গতা, প্রেম, স্মৃতি ও ইতিহাসের জটিল সম্পর্ক। উপন্যাসটি দ্রুতই বিশ্বসাহিত্যের এক ক্লাসিকে পরিণত হয়।
মার্কেজের আরেক বিখ্যাত উপন্যাস ‘ লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’ যেখানে প্রেমের দীর্ঘ অপেক্ষা ও মানবিক অনুভূতির গভীরতা অনন্য কাব্যিকতায় ফুটে উঠেছে। তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রায়ই দেখা যায় লাতিন আমেরিকার ইতিহাস, ঔপনিবেশিকতার অভিজ্ঞতা এবং মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতির মিলিত প্রতিফলন।
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮২ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন মার্কেজ। নোবেল কমিটি তাঁর লেখাকে লাতিন আমেরিকার জীবনের এক সমৃদ্ধ প্রতিচ্ছবি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
মার্কেজ শুধু কথাসাহিত্যিকই নন, ছিলেন একজন প্রভাবশালী সাংবাদিক ও রাজনৈতিক সচেতন লেখকও। সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর সহানুভূতি ছিল এবং লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁর লেখায় নানা রূপে উঠে এসেছে। তবে তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্যকে সরাসরি রাজনৈতিক প্রচারণায় পরিণত করা উচিত নয়; বরং মানুষের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও কল্পনার মধ্য দিয়েই বাস্তবতার গভীর সত্য প্রকাশ পায়।
২০১৪ সালের ১৭ এপ্রিল মেক্সিকো সিটিতে মৃত্যুবরণ করেন এই বিশ্বখ্যাত লেখক। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আজও পাঠককে একইভাবে আলোড়িত করে।
