দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অদক্ষতায় সিলেটের সাদা পাথরক্ষেত্রগুলো যেন অসীম লুটপাটের রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা, রাজনৈতিক প্রশ্রয় আর প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এ ভাণ্ডার হারাতে বসেছিল তার স্বাভাবিক রূপ। অবশেষে, পরিবেশ ও সম্পদ রক্ষায় যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান সেই ঘুম ভাঙিয়েছে—ফিরিয়ে এনেছে হাজার হাজার ঘনফুট পাথর, আর জাগিয়ে তুলেছে টালমাটাল বিবেক।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে অবৈধভাবে উত্তোলিত প্রায় ১২ হাজার ঘনফুট সাদা পাথর যৌথ বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হয়েছে। বুধবার রাত থেকে কালাইরাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাথরগুলো জব্দ করে পুনরায় নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। সিলেট-ভোলাগঞ্জ সড়কের সিলেট ক্লাবের সামনে চেকপোস্ট বসিয়েও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফারজানা আক্তার মিতা জানান, চুরি হওয়া পাথর উদ্ধারে অভিযান চলবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের যৌথ তৎপরতায় কলাবাড়ী এলাকায় পাথর ভাঙার যন্ত্রের বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
এর আগে জাফলংয়ের বল্লাঘাট, ঝুমপাহাড় ও জিরো পয়েন্ট এলাকায় ১০০টি অবৈধ নৌকা ভেঙে ফেলা হয় এবং ১৩০ ফুট বালু জব্দ করা হয়।
প্রস্তর লুণ্ঠনের রাজনৈতিক ঐক্য
ভোলাগঞ্জ শ্বেতপ্রস্তরের জন্য বিখ্যাত হলেও এখানে বহুদিন ধরেই চলছে পাথর লুটের মহোৎসব। একসময় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই ক্ষেত্র এখন প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সমর্থনপুষ্ট। ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর সরকার ইজারা বাতিল করলেও দলীয়, শ্রমিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখে অভিযান ব্যাহত হয়েছে। এমনকি সরকারের দুই উপদেষ্টা জাফলং গেলে তাদের গাড়িবহরে বাধা দেওয়া হয়; পরিবেশ উপদেষ্টা নিজেও পাথর উত্তোলন বন্ধে ব্যর্থ হওয়ার হতাশা প্রকাশ করেছেন।
এক বছরে এত বেশি পাথর লুট হয়েছে যে ভোলাগঞ্জ এখন পাথরের বদলে অসংখ্য গহ্বরের ভূদৃশ্যে পরিণত। পূর্বে রেল বাঙ্কার এলাকার নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যেও পাথর লুট সম্ভব হয়েছিল—যা প্রশাসনের গাফিলতি প্রমাণ করে। স্থানীয় সাংবাদিক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতারা ‘শ্রমিকের জীবিকার’ যুক্তি তুলে ধরে এই লুণ্ঠনকে প্রশ্রয় দিয়েছেন।
আইন ও পরিবেশের অবমাননা
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির তথ্যমতে, সিলেটের আটটি প্রস্তরক্ষেত্রেই যান্ত্রিক ‘বোমা মেশিন’ দিয়ে পাথর উত্তোলন পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও গত এক বছরে তা অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসনের ভূমিকা সীমিত, মামলাও অপ্রতুল; ফলে অপরাধীরা অদণ্ডিত থেকে যাচ্ছে।
ভোলাগঞ্জের পাথর কেবল সিলেট নয়, দেশেরও সম্পদ। পরিবেশ রক্ষা ও পর্যটন উন্নয়নে সরকারকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিকল্পিতভাবে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুললে স্থানীয় মানুষ কর্মসংস্থান ও আয়—উভয় দিক থেকেই বেশি লাভবান হবে। প্রকৃতিকে তার স্বাভাবিক রূপে থাকতে দেওয়া ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সবার ক্ষতি অনিবার্য।
