মহিবুল্লাহর বিরুদ্ধে ঘুষ, আর্থিক অনিয়ম ও বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের অভিযোগ

সিনিয়র সহকারী জজ শেখ মো. মহিবুল্লাহ (বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত) এর বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীর ভাটারা থানায় এক ভুক্তভোগী নারী মামলা দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, একজন একক (সিঙ্গেল) মায়ের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে শেখ মো. মহিবুল্লাহ নানা প্রলোভন ও ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং পরে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। ওই নারীর অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন অজুহাতে তিনি তাঁর কাছ থেকে প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেন।

বিশেষ প্রতিনিধি :

8 Min Read
শেখ মো. মহিবুল্লাহ

দেশের বিচার বিভাগের একজন সিনিয়র সহকারী জজের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম এবং বিয়ের প্রলভনে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীর দেওয়া কল রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রমাণসহ মামলা ও তদন্তের নথি বর্তমানে প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। অভিযুক্ত শেখ মো. মহিবুল্লাহ বর্তমানে আইন ও বিচার বিভাগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। আইন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, তার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই বিভাগীয় মামলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

তাঁর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনেও একটি অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।

দুদক অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, শেখ মহিবুল্লাহ হাসান ওরফে মহিবুল্লাহ শেখ বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি জিয়া হলের সক্রিয় ছাত্রলীগ কর্মী ছিলেন। সে সময় ফেনী-১ আসনের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিন নাসিমের প্রত্যক্ষ সুপারিশে এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে, জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল না থাকা সত্ত্বেও মৌখিক পরীক্ষায় প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ লাভ করেন যা ফেনী সদর উপজেলার অনেকেই জানেন।

একই প্রভাব ও সুপারিশের সূত্রে তাঁর ছোট ভাই শেখ মোহাম্মাদুল্লাহ রিয়াদও বাংলাদেশ ব্যাংকে সহকারী পরিচালক পদে চাকরি লাভ করেন।

এরাই সেই গোষ্ঠী যারা বিগত সরকার থেকে সকল সুবিধা নিয়ে এখন প্রশাসনের ভিতরে বসে স্বপ্ন দেখছে ফ্যাসিস্ট হাসিনা ফিরবেন, এবং তদন্ত করলে তাদের খুঁটি ও যোগাযোগ সূত্র সামনে আসবে।

নোয়াখালীতে সহকারী জজ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শেখ মো. মহিবুল্লাহ বিরোধীদল দমন ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর দমন-পীড়নে সক্রিয় ভূমিকা রেখে হাসিনা সরকারের আস্থাভাজন ‘ইয়াং অফিসার’ হিসেবে দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে—আওয়ামী লীগ নেতা এ এইচ এম খায়রুল আনম চৌধুরী, শিহাব উদ্দিন এবং সহিদ উল্যাহ খানের নেতৃত্বাধীন একটি সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশ করে বিচার বিভাগকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ওই সিন্ডিকেটের হয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখার পুরস্কারস্বরূপ তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে আস্থা অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে সিনিয়র সহকারী জজ পদে পদোন্নতিও লাভ করেন।

২০২২ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শেখ মো. মহিবুল্লাহর প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিপুল অর্থের বিনিময়ে ভোটকেন্দ্র দখল করে আওয়ামী লীগ–মনোনীত প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সেনবাগের মোহাম্মদপুর, কেশারপাড় ও অর্জুনতলার সাধারণ মানুষ তাঁর সেই ভোট কারচুপি ও অনিয়মের প্রত্যক্ষ সাক্ষী।

২০২৪ সালের নির্বাচনে শেখ মো. মহিবুল্লাহ আরও আগ্রাসী ও পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা পালন করেন। তিনি চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সেখানে সাবেক হুইপ সামশুল হকের ঘনিষ্ঠজন ও “পকেটের জজ” হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের আস্থাভাজন হয়ে তিনি নির্লজ্জভাবে দলীয় স্বার্থে কাজ করেন, যেন একজন বিচারক নয় বরং দলীয় কর্মী। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিরোধী দল ও ভিন্নমতের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বিচার ছাড়াই জেলা পর্যায়ে জরিমানা আরোপ করেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। এমনকি নিজ অফিসেও তিনি সহকর্মীদের অনেক সময় ‘জামায়াত-বিএনপি ট্যাগ’ দিয়ে হেনস্তা করতেন বলে একাধিক সূত্রে অভিযোগ উঠেছে।

নোয়াখালী ও পটিয়ায় দায়িত্ব পালনকালে শেখ মো. মহিবুল্লাহর বিরুদ্ধে একাধিক লিখিত অভিযোগ আইন মন্ত্রণালয়ে জমা পড়লেও, রহস্যজনক কারণে সেসব অভিযোগ কখনো তদন্তের মুখ দেখেনি। তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ ছিল। ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে নোয়াখালী ও পটিয়ায় দলীয় প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করার দাবিতে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই দুই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখার বিনিময়ে তিনি দলীয় সূত্র থেকে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা পেয়েছিলেন—এ তথ্য তিনি নিজেই একাধিক ব্যক্তিগত আলাপে স্বীকার করেছেন, বলে জানা যায়।

- Advertisement -

আর জানা যায়, চাকরি জীবনের শুরু থেকেই ঘুষ ও অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে থাকেন শেখ মো. মহিবুল্লাহ। সেই অবৈধ অর্থে তিনি ফেনী সদরের কাবিল মাঝি বাড়ি এলাকায় একটি আধুনিক বসতবাড়ি নির্মাণ করেছেন। এছাড়া নামে-বেনামে ফেনী সদর ও ঢাকায় তাঁর একাধিক স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, যা বিস্তারিত তদন্তের দাবি রাখে। তাঁর সাবেক কর্মস্থলের একাধিক সহকর্মী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে—জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি, মামলা মীমাংসা এবং জামিন আদায়ের ক্ষেত্রে তিনি নির্দিষ্ট হারে ঘুষ গ্রহণ করতেন, যা ছিল তাঁর ‘নিয়মিত আয়ের উৎস’।

বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ ও অর্থ আত্মসাৎ

সিনিয়র সহকারী জজ শেখ মো. মহিবুল্লাহ (বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত) এর বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীর ভাটারা থানায় এক ভুক্তভোগী নারী মামলা দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, একজন একক (সিঙ্গেল) মায়ের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে শেখ মো. মহিবুল্লাহ নানা প্রলোভন ও ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং পরে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। ওই নারীর অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন অজুহাতে তিনি তাঁর কাছ থেকে প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেন।

- Advertisement -

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এই প্রতারক বিচারককে সুপ্রিম কোর্ট থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলে, তিনি নানা কৌশলে ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি মাত্র ১০০ টাকা কাবিনে বিয়ে করেন এবং পরবর্তীতে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। এরপর তিনি ভুক্তভোগী নারীকে বারবার ভয়ভীতি ও হুমকি দিতে থাকেন। এমনকি এক পর্যায়ে তাঁর বাসায় গিয়ে “দেখে নেওয়ার” হুমকি দেন। এতে আতঙ্কিত হয়ে ভুক্তভোগী নারী ২০২৫ সালের ১১ মার্চ ভাটারা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (নম্বর: ১০৮৫) করেন।

দুই দিন পর, অর্থাৎ ১৩ মার্চ ২০২৫ তারিখে তিনি সকল প্রমাণপত্রসহ আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। ভাটারা থানার তদন্তে ১০৮৫ নম্বর সাধারণ ডায়েরির সত্যতা পাওয়া যায়, যেখানে শেখ মো. মহিবুল্লাহ ছাড়াও তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু কেএম আলমগীরের নাম উঠে আসে। পরবর্তীতে জানা যায়, এই কেএম আলমগীরও একজন বিচারক।

দেশের বিচার ব্যবস্থা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাই ভুক্তভোগীর বাড়িতে গিয়ে তাকে ভয়ভীতি প্রদানের মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এখানে কেবল দুজনের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, তবে এমন অন্তত সাতজন কর্মকর্তা রয়েছেন, যাদের কাঁধে দেশের সংবিধান ও বিচারবিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত। তারা যথাযথ বিচার না করে প্রলোভন, তদবির ও হুমকির মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে মানসিকভাবে হেনস্থা করছেন। ইতিমধ্যে ভুক্তভোগী সমস্ত অভিযুক্তের নাম ও তাদের কর্মকাণ্ডসহ বিস্তারিত অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেছেন। দেশের বিচার বিভাগের সুনাম ও ইমেজের ক্ষতি না ঘটে সে কারণে এখানে তাদের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

এতকিছুর পরও শেখ মো. মহিবুল্লাহ ভুক্তভোগী নারীকে দুটি মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে তাঁর উপর অবৈধ চাপ প্রয়োগ চালাচ্ছেন। প্রশাসনিক সুবিধা ও প্রভাব ব্যবহার করে তিনি নিয়মিতভাবে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে মানসিকভাবে হেনস্তা করছেন। সূত্রে জানা গেছে, তাঁর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই বিভাগীয় মামলার সিদ্ধান্ত হয়েছে; তবুও তিনি বিভিন্ন কৌশলে দৈনন্দিন ভিত্তিতে ওই পরিবারকে হয়রানি করতে অব্যাহত রেখেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে শেখ মো. মহিবুল্লাহকে ফোন করলে তিনি কলটি কেটে দেন এবং তাঁর দুটি নম্বরে মেসেজ পাঠিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *