ওয়াশিংটন বনাম তেহরান: একটি দীর্ঘ যুদ্ধের গল্প

মনিরুল ইসলাম :

4 Min Read

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক উত্তেজনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আলোচনায় একটি ব্যাখ্যাই সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে এই সংকটের মূল কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর আক্রমণাত্মক কূটনীতি, বহুপাক্ষিক চুক্তি ভেঙে বেরিয়ে আসার প্রবণতা এবং শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতি ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে বিপজ্জনক পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

কিন্তু এই ব্যাখ্যা যতটা সহজ, ততটাই অসম্পূর্ণ। ইরান–যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বকে শুধু একজন নেতার ব্যক্তিত্বে সীমাবদ্ধ করা ইতিহাস ও বাস্তবতাকে খণ্ডিতভাবে দেখার শামিল। বাস্তবে এই সংঘাতের শিকড় বহু গভীরে, যা ট্রাম্পের অনেক আগেই গড়ে উঠেছে এবং মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।

১৯৫৩: সংকটের সূচনাবিন্দু

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের শুরু ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব দিয়ে নয়, বরং ১৯৫৩ সালে। সে বছর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করতে সিআইএ ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬ যৌথভাবে অভ্যুত্থান সংগঠিত করে। লক্ষ্য ছিল ইরানের তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষা।

এই ঘটনাই একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রতিষ্ঠা করে ইরানের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত যদি পশ্চিমা স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তবে সেখানে হস্তক্ষেপ বৈধ।

ইসলামী বিপ্লব ও প্রতিরোধের রাজনীতি

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব এই আধিপত্যবাদী কাঠামোর সরাসরি প্রত্যাখ্যান ছিল। পশ্চিমা দৃষ্টিতে এটি ‘চরমপন্থা’ হিসেবে চিহ্নিত হলেও ইরানের ভেতরে বিপ্লবটি দেখা হয় রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার পুনরুদ্ধার হিসেবে।

এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ ও সামরিক হুমকি আরোপ করে আসছে। এই চাপ শুধু নিরাপত্তা বা পারমাণবিক প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইরানের রাজনৈতিক পরিচয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি কৌশল।

দ্বৈত মানদণ্ড ও অবিশ্বাস

- Advertisement -

১৯৮০–৮৮ সালের ইরান–ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ইরানি দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। ইরানকে ‘সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক’ আখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি ওয়াশিংটন সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন দেয়, এমনকি রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কার্যকর প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।

১৯৮৮ সালে ইরানি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাও তেহরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতার প্রতীক হয়ে আছে।

পারমাণবিক ইস্যু ও কূটনীতির সীমা

- Advertisement -

স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইরানবিরোধী চাপের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে পারমাণবিক কর্মসূচি। ক্লিনটন প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে জর্জ ডব্লিউ বুশের ‘অ্যাক্সিস অব ইভিল’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে একটি দ্বিদলীয় ঐকমত্য গড়ে ওঠে।

২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি (JCPOA) এই ধারার বাইরে কোনো ব্যতিক্রম নয়। এটি ছিল দীর্ঘদিনের চাপের নীতিকে সাময়িকভাবে কূটনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা। ট্রাম্প প্রশাসনের চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানো সেই কাঠামোরই কঠোর প্রকাশ।

ট্রাম্প: কারণ নয়, লক্ষণ

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরান সংকটের একমাত্র দায়ী করা বাস্তবতা আড়াল করে। তিনি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের বহু দশকের ইরাননীতির সবচেয়ে খোলামেলা প্রকাশ। ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি, সামরিক হামলা ও কূটনীতির অবমূল্যায়ন এ সবই আগের ধারাবাহিকতার অংশ।

ইউরোপের নীরব ভূমিকা

এই সংকট বিশ্লেষণে ইউরোপের ভূমিকাও প্রশ্নের বাইরে নয়। ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ, ইরাক যুদ্ধে নীরবতা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় কার্যত সহযোগিতা ইউরোপকেও এই সংঘাতের অংশীদার করে তুলেছে।

সামনে কী?

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা কোনো সাময়িক রাজনৈতিক নাটক নয়। এটি একটি দীর্ঘ ইতিহাসের ফল, যেখানে সার্বভৌমত্বের দাবি মুখোমুখি হয়েছে আধিপত্যের রাজনীতির সঙ্গে। কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তনের আশায় এই সংকটের সমাধান হবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।

আসল চ্যালেঞ্জ হলো এই সংঘাতের কাঠামোগত শিকড় স্বীকার করা এবং শক্তি প্রদর্শনের বাইরে গিয়ে নতুন নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক কাঠামো নিয়ে ভাবা। তা না হলে ট্রাম্পের পরও সংঘাতের চক্র অব্যাহত থাকবে।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *