বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫–এর জন্য কবিতায় মনোনীত হলেও শেষ পর্যন্ত পুরস্কার পাননি কবি মোহন রায়হান। অভিযোগ ওঠায় তাঁর পুরস্কার আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি প্রকাশ করেন মোহন রায়হান। তিনি দাবি করেন, পুরস্কারের জন্য কোনো ধরনের তদবির করেননি; পুরস্কার কমিটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁকে নির্বাচিত করেছিল। এমনকি পুরস্কার গ্রহণের প্রস্তুতি ও মহড়াতেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন।
কবি মোহন রায়হান ফেসবুকে লিখেছেন;
প্রিয় দেশবাসী – সালাম জানবেন।
আপনারা অবগত আছেন, এবার ২০২৫ বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার (কবিতায়), আমাকে প্রদান করা হয়েছিল।
এই পুরস্কার আমার একদমই প্রত্যাশা ছিল না। আমি একজনের কাছেও পুরস্কারের জন্য তদবির করিনি। পুরস্কার কমিটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাকে নির্বাচিত করে। গতকাল পুরস্কারপ্রাপ্তদের ডেকে এসএসএফ পুরস্কার গ্রহণের রিহার্সেল প্রদান করে। আজ অনুষ্ঠানের সূচনায়ও আমার নাম ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু পুরস্কার প্রদানের সময় আমাকে আর ডাকা হয়নি। জানতে পারলাম, ৪১ বছর আগে কর্ণেল তাহেরকে নিয়ে লেখা আমার কবিতা ”তাহেরের স্বপ্ন” কবিতার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিয়ে একটি মহল আমার পুরস্কার বাতিল করিয়েছে।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম গণমাধ্যমকে বলেন, কবির বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ রয়েছে। সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের স্বার্থে পুরস্কার প্রদান আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। অভিযোগ পর্যালোচনা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এর আগে গত সোমবার একাডেমির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ২০২৫ সালের সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মনোনীতদের নাম ঘোষণা করা হয়। তবে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে তাঁর নাম আর চূড়ান্ত তালিকায় রাখা হয়নি।
এ বিষয়ে একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম জানান, কবির লেখা ও সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ে আপত্তি ওঠায় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। তদন্ত শেষ হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
মোহন রায়হান বর্তমানে জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ নিষ্পত্তির পর তাঁর পুরস্কার প্রাপ্তি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের তালিকায় কবি মোহন রায়হান-এর নাম অন্তর্ভুক্ত করাকে কেন্দ্র করে একদল কবি-সাহিত্যিক তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে তারা এই মনোনয়নকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ উল্লেখ করে অবিলম্বে তাঁর নাম প্রত্যাহারের দাবি জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিতর্কিত অতীত রয়েছে এমন একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সাহিত্য সম্মাননায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা মেধা ও দেশপ্রেমের অবমূল্যায়ন হিসেবে বিবেচিত হবে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-কে নিয়ে রচিত একটি নাটক ও বিভিন্ন মন্তব্যের মাধ্যমে ইতিহাস বিকৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে মোহন রায়হানের বিরুদ্ধে।
প্রতিবাদকারীরা আরও দাবি করেন, দীর্ঘদিন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিশীল ধারার সাহিত্যচর্চা করে আসা লেখকদের উপেক্ষা করে এমন বিতর্কিত ব্যক্তিকে পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করা হলে তা মূলধারার সাহিত্যাঙ্গনে হতাশা তৈরি করবে।
ফ্যাসিবাদবিরোধী সাহিত্য আন্দোলনের ব্যানারে দেওয়া ওই বিবৃতিতে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের ২৭ জন কবি ও সাহিত্যিক স্বাক্ষর করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ছড়াকার আবু সালেহ, কবি মাহবুব হাসান, কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ, কবি শামসুদ্দিন হারুন, কবি শাহীন রেজা, কবি ফেরদৌস সালাম, কথাসাহিত্যিক ইউসুফ শরীফসহ আরও অনেকে।
বিবৃতিতে ‘সাংস্কৃতিক সিন্ডিকেট’ পুনরায় সক্রিয় হওয়ার অভিযোগও তোলা হয় এবং বর্তমান সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে কবি শামসুদ্দিন হারুন বলেন, তারা চান বিতর্ক এড়াতে পুরস্কারের তালিকা পুনর্বিবেচনা করা হোক এবং যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য কাউকে এ সম্মাননা প্রদান করা হোক।
