রাজনীতিতে ডিম নিক্ষেপ নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বহু বছর ধরেই এটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ, জনঅসন্তোষ কিংবা প্রতীকী প্রতিরোধের একটি বহুল আলোচিত মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সম্প্রতি বাংলাদেশেও রাজনৈতিক নেতাদের লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপের কয়েকটি ঘটনা আলোচনায় এসেছে। এর মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে ‘এগিং’ নামে পরিচিত এই প্রতিবাদ সংস্কৃতির ইতিহাস ও তাৎপর্য।
শুক্রবার (২২ মে) ঝিনাইদহে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় কয়েকজন যুবক তাকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। এতে স্থানীয় কয়েকজন কর্মী আহত হন।
যদিও এর আগে ঢাকায় চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি দুপুরে হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজের একটি অনুষ্ঠানে ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ওপর ডিম নিক্ষেপ করা হয়েছিল।
এর আগে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের প্রতিনিধি দলের সদস্য ও এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনের ওপরও ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনাগুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।
পুরোনো এক রাজনৈতিক প্রতিবাদ
ইতিহাসবিদদের মতে, ডিম নিক্ষেপের রীতি বহু পুরোনো। ইংল্যান্ডে ১৬ ও ১৭ শতকে খারাপ অভিনেতা বা অপছন্দের জনসম্মুখ ব্যক্তিদের দিকে পচা ডিম ছোড়ার প্রচলন ছিল। পরে এটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রতিবাদের অংশ হয়ে ওঠে।
রোমান সাম্রাজ্যের সময়েও শাসকদের বিরুদ্ধে জনতার প্রতীকী আক্রমণের নজির পাওয়া যায়। আধুনিক যুগে অবশ্য ডিম নিক্ষেপকে তুলনামূলক কম সহিংস প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হয়, কারণ এতে সাধারণত প্রাণঘাতী ঝুঁকি কম থাকে।
বিশ্ব রাজনীতিতে আলোচিত ঘটনা
ডিম নিক্ষেপের ইতিহাসে সর্বশেষ আলোচিত ঘটনা হলো ২০১৯ সালের উইলিয়াম কনলি-এর ঘটনা। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে একটি মসজিদে হামলার পর অস্ট্রেলিয়ার চরমপন্থী রাজনীতিবিদ ফ্রেজার অ্যানিং মুসলিমদের দোষারোপ করলে, কনলি তার মাথায় ডিম নিক্ষেপ করেন। ঘটনা মুহূর্তেই সামাজিক ও সংবাদমাধ্যমে ভাইরাল হয়। অ্যানিং কিশোরের প্রতি প্রতিক্রিয়ায় দুইবার আঘাত করলেও, জনমত পুরোপুরি কনলির পক্ষে থাকে। কনলির আইনি খরচ এবং আরও ডিম সংগ্রহের জন্য GoFundMe চালু হয়, যেখানে ৩,০০০-এর বেশি মানুষ ৬৩,০০০ ডলারের বেশি দান করেন। কনলি পরে জানিয়েছেন, দানের বড় অংশ মসজিদ হামলার ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য ব্যবহার করা হবে। এছাড়াও ;
২০১০: ভবিষ্যৎ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ১৬ বছর বয়সী এক ছাত্রের ডিম নিক্ষেপের শিকার।
যুক্তরাজ্য: এড মিলিব্যান্ড ও ইউকিপ নেতা নাইজেল ফারাজ একাধিকবার ডিম নিক্ষেপের শিকার।
২০১৯: জেরেমি করবিন লন্ডনের ফিন্সবেরি পার্ক মসজিদে ডিম নিক্ষেপের শিকার।
২০০১: সাবেক ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার জন প্রেস্কট উত্তর ওয়েলসে প্রচার অভিযানের সময় ডিমে আঘাত পান।
জার্মানি ও ফ্রান্স: চ্যান্সেলর হেলমুট কোল ও অর্থমন্ত্রী এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ডিম নিক্ষেপের শিকার।
আমেরিকা ও ব্রাজিল: রিচার্ড নিকসন, বিল ক্লিনটন এবং মারিয়া ভিক্টোরিয়া বারোসকে ডিম নিক্ষেপ করা হয়।
ডিম নিক্ষেপের কারণে জন্ম হয় কমনওয়েলথ পুলিশ ফোর্সের
ডিম নিক্ষেপের প্রভাব এমনকি অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ বাহিনী গঠনেও দেখা যায়। ১৯৫২ সালে কুইন্সল্যান্ডে দুই ভাই প্যাট ও বার্ট ব্রসনান প্রাইম মিনিস্টার বিলি হিউজ-এর ওপর ডিম নিক্ষেপ করেন। ঘটনার পর হিউজের সমর্থকরা ব্রসনানদের ধাক্কা দিয়ে স্টেশন থেকে বের করে দেন। প্যাট পরে জানান, তিনি শুধুমাত্র বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিরোধিতা করার জন্য ডিম নিক্ষেপ করেছিলেন। এই ঘটনার ফলস্বরূপ অস্ট্রেলিয়ায় কমনওয়েলথ পুলিশ ফোর্স (বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ) গঠিত হয়, যা বিশেষভাবে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য তৈরি করা হয়।
প্রতিবাদ না অপরাধ?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ডিম নিক্ষেপকে কেউ কেউ প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে দেখলেও অধিকাংশ দেশেই এটি আইনত দণ্ডনীয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে এটি শারীরিক হামলা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা সম্পত্তির ক্ষতির আওতায় বিচারযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশেও রাজনৈতিক সহিংসতার নতুন রূপ হিসেবে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক সমাজে মতবিরোধ প্রকাশের সাংবিধানিক পথ থাকলেও ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক আচরণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আরও অসহিষ্ণু করে তুলতে পারে।
