করপোরেট চাকরি ছিল, ছিল স্থায়ী আয়ের নিশ্চয়তাও। কিন্তু প্রকৃতি আর সবুজের প্রতি টান তাকে ভিন্ন পথে হাঁটার সাহস জুগিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত থেকেই জন্ম নেয় ল্যান্ডস্কেপিং প্রতিষ্ঠান ‘শৈল্পিক অরণ্য’। কয়েক বছরের ব্যবধানে ছোট পরিসরের একটি উদ্যোগ এখন পরিণত হয়েছে একটি স্বতন্ত্র ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে।
গত অর্ধযুগে নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে ঢাকায় গড়ে তুলেছেন চারটি নিজস্ব বাগান। রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএসে প্রতিষ্ঠা করেছেন করপোরেট অফিসও। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ জন কাজ করছেন।
আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের পাশাপাশি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ল্যান্ডস্কেপিং প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘শৈল্পিক অরণ্য’ ইতোমধ্যে নিজস্ব পরিচিতি তৈরি করেছে। পরিকল্পিত সবুজায়ন, আধুনিক নকশা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ সেবার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের ল্যান্ডস্কেপিং খাতে একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে।
বাংলাদেশে ল্যান্ডস্কেপিং শিল্পের বর্তমান অবস্থা, সম্ভাবনা, দক্ষ জনবল তৈরির প্রয়োজনীয়তা এবং এই খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আমাদের বিশেষ প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছেন উদ্যোক্তা সোনিয় হক।
নিউজনেক্সট: আপনার উদ্যোক্তা হওয়ার শুরুর গল্পটা জানতে চাই।
সোনিয়া হক: শুরুতে আমি একটি বিদেশি দূতাবাসে চাকরি করতাম। প্রতিদিন অফিসে যাতায়াতের পথে গুলশান ও বনানী এলাকার রাস্তার পাশে ছোট ছোট গাছের দোকানগুলো আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করত। সেখান থেকেই ভাবতে শুরু করি আমাদের দেশের দক্ষিণাঞ্চল, বিশেষ করে আমার জন্মস্থান পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি তো চারা উৎপাদনের জন্য বেশ পরিচিত। আমাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
চাকরি করলেও নিজের কিছু করার ইচ্ছাটা সব সময়ই ছিল। মনে হতো একসময় এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলব, যেখানে প্রকৃতি ও সবুজকে ঘিরেই কাজ করা যাবে। শৈশবের সবুজ পরিবেশ, পারিবারিক অভিজ্ঞতা এবং প্রতিদিন দেখা সেই গাছের দোকানগুলোই আমাকে ল্যান্ডস্কেপিং খাতে কাজ করার অনুপ্রেরণা দিয়েছে।
পরে বিষয়টি আমার স্বামীর সঙ্গে আলোচনা করি। তিনি শুরু থেকেই আমাকে উৎসাহ ও সাহস দিয়েছেন। চাকরি থেকে জমানো অল্প কিছু সঞ্চয়ই ছিল মূলধন। সেই পুঁজি নিয়েই যাত্রা শুরু করি আমার প্রতিষ্ঠান ‘শৈল্পিক অরণ্য’।
নিউজনেক্সট: আপনার প্রতিষ্ঠান মূলত কোন ধরনের ল্যান্ডস্কেপিং সেবা দিয়ে থাকে?
সোনিয়া হক: আমরা আবাসিক ও বাণিজ্যিক—দুই ধরনের প্রকল্পেই কাজ করি। তবে বড় বাণিজ্যিক প্রকল্প এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ল্যান্ডস্কেপিংয়ে কাজ করার মাধ্যমে আমাদের প্রতিষ্ঠান একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে।
আর সেবার পরিধির কথা বলতে গেলে,
আমরা ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন ও বাস্তবায়ন, ড্রিপ ইরিগেশন ব্যবস্থা, ছাদবাগান (রুফটপ গার্ডেন) তৈরি, বাগানের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, বিভিন্ন ধরনের গাছের সরবরাহ ও রোপণ, কৃত্রিম জলপ্রপাত (ওয়াটারফল) ও ফোয়ারার নকশা এবং নির্মাণ, পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অনুষ্ঠানের জন্য প্ল্যান্ট রেন্টাল সেবাও দিয়ে থাকি।
আমাদের লক্ষ্য শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধি নয়, বরং প্রতিটি প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং কার্যকর সবুজায়নের সমাধান নিশ্চিত করা।
নিউজনেক্সট: নতুন কোনো ল্যান্ডস্কেপিং প্রকল্প হাতে নেওয়ার সময় কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন?
সোনিয়া হক: প্রতিটি প্রকল্পেই আমরা প্রথমে জায়গাটির পরিবেশ, ব্যবহার ও দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন বিশ্লেষণ করি। আমাদের লক্ষ্য থাকে এমন একটি সবুজ পরিবেশ তৈরি করা, যা একদিকে যেমন দৃষ্টিনন্দন হবে অন্যদিকে তেমনি প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং টেকসই হবে। আমরা সবসময় পরিবেশবান্ধব উপকরণ ও উন্নতমানের সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করি। কারণ একটি ভালো ল্যান্ডস্কেপিং শুধু সৌন্দর্য বাড়ায় না, পরিবেশের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এ ছাড়া প্রতিটি প্রকল্পে সৃজনশীলতা ও নান্দনিকতার সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করি। সময়ের সঙ্গে ল্যান্ডস্কেপিংয়ের ধারণা ও প্রযুক্তি বদলাচ্ছে। তাই নতুন ডিজাইন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের কাজের ধরনও নিয়মিত উন্নত করছি।
আমার বিশ্বাস একটি সফল ল্যান্ডস্কেপিং প্রকল্পের মূল ভিত্তি হলো পরিকল্পনার সূক্ষ্মতা, কাজের মান এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত করা। তাই প্রতিটি কাজেই আমরা দক্ষতা, মান এবং উৎকর্ষ বজায় রাখার চেষ্টা করি।
নিউজনেক্সট: অর্ধযুগের এই যাত্রার দিকে ফিরে তাকালে এখন কী অনুভব করেন?
সোনিয়া হক: যখন শুরু করি তখন আমরা ছিলাম মাত্র দুজন। আজ প্রতিষ্ঠানটিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ জন কাজ করছেন। ঢাকায় আমাদের চারটি নিজস্ব বাগান রয়েছে, পাশাপাশি মিরপুর ডিওএইচএসে একটি করপোরেট অফিসও গড়ে তুলেছি। এই পথচলার দিকে ফিরে তাকালে অবশ্যই ভালো লাগে। তবে আমার কাছে মনে হয়, এটি কেবল শুরু। সামনে আরও অনেক দূর যেতে হবে।
আমি বিশ্বাস করি, ল্যান্ডস্কেপিং শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রা, পরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ভবিষ্যতেও পরিবেশবান্ধব চর্চা, টেকসই উন্নয়ন এবং নান্দনিক নকশার সমন্বয়ে এমন সব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাই, যা মানুষের জীবনমান উন্নত করবে এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
সবচেয়ে বড় কথা মানুষকে প্রকৃতির প্রতি আরও সচেতন ও আগ্রহী করে তুলতে চাই। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি সবুজ, প্রাণবন্ত ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে ভূমিকা রাখা, যেখানে উন্নয়ন ও প্রকৃতি একসঙ্গে এগিয়ে যাবে।
নিউজনেক্সট: বাংলাদেশে ল্যান্ডস্কেপিং খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনাকে কীভাবে দেখেন?
সোনিয়া হক: আমার মনে হয়, বাংলাদেশে এই খাতের সম্ভাবনা অনেক বড়। জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়গুলো এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে পরিকল্পিত সবুজায়ন এবং পেশাদার ল্যান্ডস্কেপিং সেবার চাহিদাও ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।
তবে এই খাতের বিকাশে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সবুজায়নকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা পরিচালনার আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলো সহজ করা হলে নতুন বিনিয়োগ ও উদ্যোগ বাড়বে। সরকারের নীতিগত সহায়তা এবং উৎসাহ এ খাতের উদ্যোক্তাদের আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে।
আমার বিশ্বাস ভবিষ্যতের পৃথিবী আরও পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়নের দিকেই এগোবে। সেই বাস্তবতায় দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি এবং পেশাদার ল্যান্ডস্কেপিং প্রতিষ্ঠানের চাহিদা দ্রুত বাড়বে। তাই এখন থেকেই এই খাতকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশেও এর অপার সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব।
নিউজনেক্সট: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
সোনিয়া হক : নিউজনেক্সটের সকল পাঠক ও আপনাকেও ধন্যবাদ।
