জীবনানন্দ দাশ যেমন সকাল-সন্ধ্যার আবহে ডুবে লিখেছেন কবিতা, তেমনি বরিশালের সেই সকাল-সন্ধ্যায় বেড়ে উঠেছেন কবি রফিক লিটন। এ প্রজন্মের সাহসী কণ্ঠস্বর ও সমাজের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবি হিসেবে তিনি পরিচিত। রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও সাহিত্য—এই তিন অঙ্গনেই সমানভাবে সক্রিয় রফিক লিটন আজকের সমাজে এক দৃঢ় প্রতিবাদী কণ্ঠ। মানুষের সংগ্রাম তাঁকে করেছে গভীর চিন্তাশীল, আর তাঁর জীবনদর্শন ও তাত্ত্বিক বোঝাপড়া পাঠক ও লেখক মহলে সমানভাবে সমাদৃত।
তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেম তুমি দ্রোহ তুমি’, ‘উড়ন্ত মন দুরন্ত মন’, ‘সেফটিপিন’ ও ‘তবু কথা থাকে’ পাঠককে কবিতার এক ভিন্ন স্বাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং নতুন অনুভবের আহ্বান জানায়।
এছাড়া রফিক লিটন সম্পাদিত ‘আবদুল হাই শিকদার : অন্তরকথন’ গ্রন্থে সন্নিবেশিত ১৬টি সাক্ষাৎকার একে অপরের থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। কোনো একধরনের সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ না থেকে এ গ্রন্থে প্রতিফলিত হয়েছে বহুমাত্রিক ভাব, বিষয়, আঙ্গিক ও অন্তর্বস্তু। স্থানীয় এবং বৈশ্বিক উপাচার এখানে মিলেমিশে এক অনন্য সংহতি তৈরি করেছে। তাঁর কবিতা ও গদ্যের মতোই এসব সাক্ষাৎকারও বাংলা সাহিত্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভিন্ন স্বর, ভিন্ন দ্যোতনা ও ভিন্ন ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ এই গ্রন্থ নিঃসন্দেহে শিল্প-সাহিত্যের এক মূল্যবান আকর।
কবি রফিক লিটনের কবিতা :
উন্মুক্ত
বৃষ্টি আর ভ্যাপসা উষ্ণতা নিয়ে যে আবহাওয়া—
তোমার দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছে, উপভোগ করো।
দিনটি তোমার। পূর্ণ করে নাও সমগ্র চাওয়া—
নইলে অবহেলিত আত্মসুর কন্ঠে তুলে ধরো।
কালিবাউশ মাছের মতো বিলুপ্ত আঁধার আজ—
খোরমা আর খেজুর খেতে পারো শঙ্কাহীন দিনে।
আলোকিত দিনে পালিয়ে গেছে বেশরম খন্নাজ,
চোখের তারার প্রোজ্জ্বলতা লহুতে নিয়েছি কিনে।
আজ আর কোনো অজুহাত নয়; সবই তোমার—
খাও-দাও, পদক্ষেপ বুনে যাও আগামীকালের।
অথবা দ্রাক্ষারসে উন্মুক্ত করো বন্ধ সে দুয়ার—
ধুলিমাখা স্মৃতি যেনো হয়ে ওঠে গল্প এ রাতের।
উপভোগ করো ফড়িংয়ের মতো নান্দনিক কাল,
পথে পথে এঁকে দাও জেগে ওঠা মানুষের হাল।
পাতার সজীবতা
আমার দুঃখ সুখের বৃষ্টি হয়ে কেবল ঝরছে —
আর সজীব হয়ে উঠছে আঙিনার এ মৃত্তিকা।
আর পাতার সজীবতার ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে;
নৃত্যরত পৃথিবীর এ যেনো এক ভিন্ন গীতিকা।
দুঃখের করাল থেকে বের হয়ে আসছে লাবণ্য,
চঞ্চুতে তাই শোভা পায় নানাবিধ আলেখ্য কথা।
এ সূর্যোদয়ে তারা যেনো গর্ব করে আমার জন্য,
সবটুকু দিয়ে লিখে যাবো পৃথিবীর সব ব্যথা।
এ যেনো এক ভিন্ন ব্যঞ্জন ঠোঁটে নিয়ে আসে হাসি
অথবা বৃষ্টির সেই সুর আন্দোলিত করে মন—
অথবা দ্রোহ জাগৃতি করে জঞ্জালের সর্বনাশী —
অথবা ধ্যানস্থ মুসাফির প্রেম গায় অনুখন।
অথবা দুঃখের জন্য আকুলতা সেই সে হৃদয়—
আমার দুঃখ ছাড়া এ চরাচরে কেউ কারো নয়।
প্রতারিত কাল
অপূর্ব রাত জোছনাময়ী আনন্দের সে আকাশ—
হঠাৎ করে আছড়ে পড়ে মৃত্যুমুখী দুর্ঘটনা।
আনন্দচিত্তে কেবল বাড়ে চিরায়ত দীর্ঘশ্বাস:
রক্তে কম্পন নিয়ে জাগে সে, মানুষেরই বেদনা।
মৃত্তিকা খুঁড়ে সজল চোখে যা পেয়েছি তা অসীম,
শত সহস্র প্রদীপ আশা আর প্রতারিত কাল।
রূপান্তরিত হতে হতে থাকে না আর মৃত্যুহীম:
তথাপি ভাবি, গন্ধম নয়—মানুষই তো মাকাল।
তবু এতো গান তবু এতো আয়োজন চারদিকে —
পৃথিবীর সবটুকু হ’লো মৃত্তিকার খোঁড়াখুঁড়ি।
সকালের আভা আর গোধূলির সংলাপ ফিকে
সন্ধ্যার কিছুটা অনুরাগ নিয়ে স্বস্তিতেই পুড়ি।
অভয় দিচ্ছি, তবু তোমাকে, হাত দুটি যদি নিতে:
—ভরা বর্ষায় মৃত্যুর মতো অস্তিত্বের বিপরীতে।
চিরায়ত সঙ্ঘাত
নির্ঘুম রাত্রি তার, দুচোখে অচেনা সে ছায়া ভাসে,
বন্দিনী নারীর মতো মুখ—মুখে তার কী যে রূপ।
আশা নিয়ে পাথরের মতো তলিয়ে যায় উচ্ছ্বাসে,
ফিরে দেখা পথ ফিরে যায় সুরত পাল্টিয়ে খুব।
দুঃসহ দিন দুঃসহ রাত চাঁদশূন্য ফিরে আসে—
তবুও কোথায় যেনো ডেকে যায় বাতাসের ধ্বনি।
কথার কোকিল ঠোঁটে শোভা পায় প্রমত্ত উদ্ভাসে,
বেলাশেষে ঘুরে আসে প্রেমিকার মতো শুক্র-শনি।
পরম পিপাসা নিয়ে রাত্রি কাটে নির্ঘুম সে রাত,
বুকের কাছে হাত রেখে চলে চিরায়ত সঙ্ঘাত।
যে যেমন পারে লুট করে নিয়ে যায় মর্জি মতো
সমস্ত সম্পদ। আর দিন দিন নিরর্থ আহত।
আহত বুকে ফেরি করে সে দৃশ্যমান কথাকলি—
পৃথিবী সুন্দর হতে পারে দিলে প্রাণ জলাঞ্জলি।
পাহাড়
মুঠোবন্দি তুলতুলে দুটি পাহাড়ে আটকে আছে—
সৌরজগতের দুটি চোখ। আর অস্তিত্বের দ্বার।
অমনি দ্যাখা দিলো সুন্দর। যেখানে সৃজন নাচে,
ধরা পড়ে গেলো জ্ঞানের সেই বৃহৎ পাঠাগার।
মুখ গুঁজে পড়ে আছি যেনো তৃষ্ণার পরম পানি—
যেনো পবিত্রতা খেলা করে প্রখর বিস্ময় নিয়ে।
যেনো পাখির কূজন দিলো আনন্দের সেই বাণী,
মৃদু কম্পনে রচিত হোলো অঢেল কাহিনি গিয়ে।
এই বুঝি নেমে এলো কণ্ঠে নিয়ে পৃথিবীর গান —
শূন্যহীন বেদনার পাশে লেখা তুমুল প্রণয়।
আঘাত ও প্রত্যাঘাতে জন্ম নেয় সব উপাদান —
হাতের মধ্যে বাঁধা পড়ে আছে অপূর্ব অভ্যুদয়।
এই চোখে চোখ রেখে একবার শুধু দেখে যাও—
বিনিময়ে জীবনটা—তারপর লিখে তুমি নাও।
