তরুণ ঘোষ: দৃশ্যের নেপথ্যের কবি, নীরব স্থপতির বিদায়

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্প নির্দেশক ও বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী তরুণ ঘোষ (৭৩) গত বুধবার রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৫৩ সালের ২০ আগস্ট রাজবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে ভারতের বরোদার এম এস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

সানাউল কবীর সিদ্দিকী :

5 Min Read
তরুণ ঘোষ, ছবি - সংগৃহীত।

চলচ্চিত্র ও দৃশ্যশিল্পের ভুবনে কিছু মানুষ থাকেন যারা সামনে নয় পেছন থেকে পুরো ফ্রেমকে নির্মাণ করেন। আলো কোথায় পড়বে, দেয়ালের রং কতটা নিস্তেজ হবে, চরিত্রের ঘরটা কেমন দেখাবে, এসব সূক্ষ্ম সিদ্ধান্ত দিয়েই তারা গল্পের ভেতরের সত্যকে দৃশ্যমান করেন। তেমনই একজন নির্মাতা-চিন্তক ছিলেন তরুণ ঘোষ, যার প্রস্থান বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির জন্য এক নীরব কিন্তু গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে।

শিল্প তাঁর কাছে ছিল কেবল পেশা নয়, একধরনের জীবনদর্শন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে পড়াশোনা দিয়ে যে যাত্রা শুরু, তা পরে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিস্তৃত হয় ভারতের এমএসইউতে। এই দুই ধারার সংমিশ্রণ দেশীয় মাটি ও আন্তর্জাতিক নান্দনিকতা তাঁর কাজের ভেতরে এক বিশেষ ভারসাম্য তৈরি করেছিল তাঁর যাপিত জীবনে।

সিনেমার ভেতরের স্থপতি :

আজকের বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে শিল্প নির্দেশনা নিয়ে যতটা সচেতন ও সংবেদনশীল কাজ হয়েছে, তার পেছনে তরুণ ঘোষের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি কাজ করেছেন মাটির ময়না, নরসুন্দর, চন্দ্রাবতী কথা’র মতো আলোচিত চলচ্চিত্রসমূহে। এছাড়াও তাঁর শিল্প নির্দেশনায় ‘সখী রঙ্গমালা’ রয়েছে মুক্তির অপেক্ষায়। তাঁর কাজের বিশেষত্বে ছিল না ঝকঝকে – চকচকে সেট, বরং তাঁর কাজে বিস্তার পেয়েছে বাস্তবতার কাছাকাছি এক ধরনের ‘অদৃশ্য সৌন্দর্য’। কীর্তনখোলা চলচ্চিত্রে তাঁর অসাধারণ শিল্পনির্দেশনার জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও অর্জন করেন। এই স্বীকৃতি কেবল একটি পুরস্কার নয়, বরং বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে শিল্প নির্দেশনার গুরুত্বকে সামনে আনার এক মাইলফলক।

বাস্তবতার ভাষা, নীরবতার শক্তি :

তরুণ ঘোষের কাজ কখনোই দর্শকের ‘চোখে পড়ার’ জন্য ছিল না বরং তা গল্পের ভেতরে মিশে যেতো গল্প হয়েই। তাঁর সেট ডিজাইন, রঙের ব্যবহার, প্রপস নির্বাচন সবকিছুই ছিল চরিত্রের মানসিক অবস্থা ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের সম্প্রসারণ। এই কারণে তাঁর কাজকে অনেকেই বলেন ‘ইনভিসেবেল আর্ট’ যা দৃশ্যমান হয় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। এই নীরব শক্তিই তাঁকে আলাদা করে দেয় সমসাময়িকদের থেকে। এমনকি চলতি সময়ের সবার কাছে তিনি গুরুস্থানীয় জায়গাটিও অর্জন করেছিলেন।

শিক্ষক, মেন্টর, নির্মাতা :

শুধু সৃজনশীল কাজেই নয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে এবং তরুণ শিল্পীদের গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। ছাত্ররা তাঁকে শুধু শিক্ষক হিসেবে নয়, বরং একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখতেন, যিনি শিল্প শেখাতেন জীবনের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে, তাল মিলিয়ে।

একটি সময়ের অবসান, একটি ধারার উত্তরাধিকার :

- Advertisement -

তারুণ ঘোষের মৃত্যু মানে কেবল একজন শিল্পীর বিদায় নয় একটি নান্দনিক ধারার ধীরে ধীরে বিলীন হওয়ার প্রক্রিয়া বরং। আজকের ডিজিটাল, দ্রুতগতির, ভিজ্যুয়াল-ওভারলোডের যুগে তাঁর মতো সংযত, মানবিক, এবং গভীর শিল্পচিন্তা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।


তাঁর কথা বলতে গিয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারপ্রাপ্ত চিত্রগ্রাহক মাজাহারুল রাজু বলেন ‘ মাওবাদীদের কাছে যেমন রেড বুক, তেমনই আমার কাছে তরুণ ঘোষ। তার শিল্পসমৃদ্ধ চৈতন্য আমাকে আঙুল ধরে জীবন, দৃশ্য আর ফোক কালচার চিনতে শিখিয়েছে। ফিল্ম ক্রু হিসেবে তার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার জন্য এক ধরনের অপ্রতিষ্ঠানিক শিক্ষালয়। সমাজ, সংস্কৃতি, রাজপথ; কোথায় ছিলেন না দৃশ্যশিল্পী তরুণ দা! শিল্প নামক ভাঁড়ামির বিরুদ্ধে এক নির্ভীক মানব শিল্পী, যিনি শিখিয়ে গেছেন শিল্প মানে শুধু সৌন্দর্য নয়, সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস।’

রাজু আরও তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন সিনেমা শুধু গল্প নয়, একটি অনুভূতির স্থাপত্য। আর সেই স্থাপত্য নির্মাণের জন্য দরকার নীরবতা, সংবেদনশীলতা, এবং গভীর পর্যবেক্ষণ।

- Advertisement -

চলচ্চিত্রকার এন. রাশেদ চৌধুরী (পরিচালক, চন্দ্রাবতী কথা ও সখী রঙ্গমালা) তাঁর কর্মজীবনের স্মৃতি থেকে তরুণ ঘোষ সম্পর্কে বলেন,

‘তরুণ ঘোষ দাদার সাথে আমার চলচ্চিত্রের কাজের অভিজ্ঞতা প্রায় ৩০ বছরের, এই দীর্ঘ্য সময়ে তরুণ দা দেখেছি কীভাবে একজন শিল্প নির্দেশক সময়নিষ্ঠতা ও নিয়মানুবর্তিতাকে প্রাধান্য দিয়ে সমগ্র চলচ্চিত্র নির্মাণ দলকে নেতৃত্ব দিয়ে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। তরুণ দার সাথে সাথে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-শিল্প নির্দেশনার একটি যুগের অবসান হলো। হারিয়ে গেল বাংলাদেশের আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি ঋদ্ধ সতন্ত্র প্রায়োগিক ধারা।

খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক নুরুল আলম আতিকের ভাষায়,

শৈশব-কৈশোরের খেলার মার্বেলগুলো আমার কাছে বন্ধুদের মতই প্রিয় ছিল। সাম্প্রতিক কালে পকেটের ফুটো গলে একটা একটা করে প্রিয় মার্বেলগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। তরুণদা ছিলেন আমার সবচেয়ে প্রিয় মার্বেলগুলোর মধ্যে অন্যতম। পিতৃসুলভ স্নেহে, বন্ধুর প্রশ্রয়ে আমাকে টেনে এনেছিলেন শিল্পের দরজায়, ওনার তল্লাবাগের বাসায়, যা ছিলো এই অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির এক ব্যক্তিগত জাদুঘর। তাঁর সংগ্রহশালা দেখেই আন্দাজ করা যেতো বাংলার লোক সংস্কৃতি কতটা সমৃদ্ধ। তরুণ দার সাথে আমার যোগাযোগ হয় সাহিত্য শিল্প সংকলন ‘নৃ’ – এর শিল্পী এসএম সুলতান সংখ্যার মাধ্যমে। তার পরবর্তী সংখ্যার পুরো আয়োজনও হয়েছিলো তরুণদার এই তল্লাবাগের বাসাতেই।

তরুণ ঘোষ ছিলেন দৃশ্যের কবি যিনি শব্দ ছাড়া কথা বলতেন, নিজ শিল্পকর্মের দ্বারা মনের ভাব প্রকাশে তিনি ছিলেন পটু ও সিদ্ধহস্ত। তাঁর নির্মিত প্রতিটি ফ্রেমে লুকিয়ে আছে মানুষের জীবন, সমাজের প্রতিচ্ছবি, এবং সময়ের অনিবার্যতা। তাঁর প্রস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভালো শিল্প কখনো উচ্চস্বরে কথা বলে না, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তা প্রতিধ্বনি হতে থাকে।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *