সামরিক আগ্রাসন না কূটনৈতিক সমাধান: কাবুল–ইসলামাবাদ সম্পর্ক কোন পথে?

মনিরুল ইসলাম:

মনিরুল ইসলাম:

8 Min Read
ছবি : ইন্টারনেট থেকে।

পাকিস্তান–আফগানিস্তান চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দেশের জন্য এখন ভিন্নধর্মী কিন্তু পরস্পর-সম্পর্কিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কাবুলকে তার ভূখণ্ড থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, আর ইসলামাবাদকে সামরিক সুবিধাকে কূটনৈতিক অগ্রগতিতে রূপান্তর করতে হবে।

সর্বশেষ সংঘর্ষে দেখা গেছে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিশেষ করে গত রাতে সীমান্তজুড়ে তীব্র সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, যেখানে ডুরান্ড লাইন (আফগানিস্তান এবং পাকিস্তান সীমান্তে অবস্থিত একটি সীমান্ত রেখা বা লাইন। এ রেখাটি পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তে প্রায় ২,৬৭০ কিলোমিটার জুড়ে অবস্থিত একটি আন্তর্জাতিক স্থল সীমান্ত।) অতিক্রম করে বিমান হামলা ও গোলাবিনিময়ের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি দ্রুত সীমিত সংঘর্ষ থেকে গভীর সামরিক মোকাবিলায় রূপ নেয়।

এই উত্তেজনার পটভূমি নতুন নয়। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) আফগান ভূখণ্ড থেকে কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং আফগান তালেবান শাসনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তা পাচ্ছে। কাবুল অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

সংকট শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, পাকিস্তানের বিরোধ আফগান জনগণের সঙ্গে নয়; বরং তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালানো সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে।

তবে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয় যখন আফগান তালেবান একাধিক সীমান্ত শহরে বড় আকারের আক্রমণাত্মক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়। ঘোষণার ভাষা ছিল প্রকাশ্য ও দৃঢ়, যা কূটনৈতিক সংযমের বদলে সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এমন ঘোষণামূলক পদক্ষেপ উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয় এবং বিচক্ষণতার সুযোগ সংকুচিত করে। এখন প্রশ্ন দুই দেশ কি সংঘাতের এই ধারা থেকে সরে এসে পারস্পরিক অভিযোগের কাঠামোগত সমাধানে এগোবে, নাকি সামরিক উত্তেজনাই সম্পর্কের প্রধান সুর হয়ে থাকবে।

উত্তেজনা বাড়ার পেছনে কাবুলের হিসাব–নিকাশ

পাকিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তালেবান সরকারের অবস্থান নিয়ে নানা বিশ্লেষণ সামনে এসেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, কাবুলের পদক্ষেপের পেছনে কয়েকটি কৌশলগত ও রাজনৈতিক হিসাব কাজ করেছে।

প্রথমত, আফগান রাজনৈতিক চিন্তাধারায় সীমান্ত প্রশ্নটি এখনও সংবেদনশীল ও ঐতিহাসিকভাবে বিতর্কিত। অনেকের কাছে এটি ঔপনিবেশিক যুগের আরোপিত বাস্তবতা হিসেবে বিবেচিত। ফলে সীমান্ত ঘিরে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপকে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ হয়।

- Advertisement -

দ্বিতীয়ত, ২২ ফেব্রুয়ারি আফগান ভূখণ্ডে সন্ত্রাসী আস্তানার বিরুদ্ধে ইসলামাবাদের বিমান হামলার পর তালেবান নেতৃত্ব শক্ত অবস্থান প্রদর্শনের প্রয়োজন অনুভব করতে পারে। কাবুল এ পদক্ষেপকে আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার অংশ হিসেবে তুলে ধরে। যদিও পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে আফগান ভূখণ্ডে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো আশ্রয় পাচ্ছে, তালেবান সরকার তা অস্বীকার করে।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এখানে একটি বড় উপাদান। সীমান্তে কঠোর অবস্থান নেওয়ার মাধ্যমে সরকার দেশের অভ্যন্তরে জাতীয়তাবাদী মনোভাবসম্পন্ন গোষ্ঠীগুলোর কাছে নিজেদের দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে চেয়েছে। এতে অভ্যন্তরীণ সমর্থন জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আরেকটি সম্ভাব্য হিসাব ছিল উত্তেজনা সীমিত পর্যায়ে থাকবে। গত বছরের অক্টোবরে তীব্র সংঘর্ষের পর কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। যদিও সেটি সাময়িক ছিল তবুও পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, কাবুল হয়তো ভেবেছিল উত্তেজনা বাড়লেও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় আবারও তা নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে।

- Advertisement -

‘গাজাব লিল-হক’ অভিযান: কড়া বার্তায় পাকিস্তান

আফগানিস্তানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান এবার কোনো কূটনৈতিক অস্পষ্টতা রাখেনি। বরং ‘গাজাব লিল-হক’ (ন্যায়পরায়ণ ক্রোধ) নামে ঘোষিত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে কাবুল, কান্দাহার, পাকতিয়া ও নাঙ্গারহার অঞ্চলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে  বিমান হামলা চালিয়েছে ইসলামাবাদ।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তাদের ধৈর্যের সীমা শেষ হয়েছে এবং পরিস্থিতি কার্যত উন্মুক্ত সংঘাতে রূপ নিয়েছে। তার এই বক্তব্যকে কূটনৈতিক ভাষার পরিবর্তে সরাসরি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

পাকিস্তানের অবস্থানও পরিষ্কার। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে দেশটিতে জঙ্গি কার্যক্রম বেড়েছে বলে দাবি করে আসছে ইসলামাবাদ। বিশেষ করে গত দেড় বছরে পাকিস্তানের ভেতরে হামলা বৃদ্ধি পাওয়ায় আফগান ভূখণ্ড থেকে উদ্ভূত হুমকির ব্যাপারে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি নিয়েছে তারা।

এই প্রেক্ষাপটে আফগান বাহিনীর পক্ষ থেকে পাকিস্তানি অবস্থানের বিরুদ্ধে আক্রমণের ঘোষণার পর পাল্টা জবাব না দেওয়ার সুযোগ খুব কম ছিল বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত উস্কানিমূলক বক্তব্যের মুখে সংযম দেখালে তা সামরিক মনোবল ও রাজনৈতিক অবস্থান উভয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারত বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

ফলে পরিস্থিতি দ্রুত এমন এক ঘূর্ণাবর্তে ঢুকে পড়ে যা সহজে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দুই পক্ষের দাবি-পাল্টা দাবি সামনে আসছে, আর সরকারি বার্তায় কঠোর অবস্থানই প্রাধান্য পাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক পথ দ্রুত সক্রিয় না হলে এই সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতায় রূপ নিতে পারে।

সীমান্তের বাইরে সংঘাতের গভীরে যে কৌশলগত সমীকরণ

পাকিস্তান–আফগানিস্তান উত্তেজনা শুধু সীমান্ত বা সামরিক সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে গভীর কৌশলগত সমীকরণ। বিশ্লেষকদের মতে, তালেবানদের সামরিক শক্তির মূল ভিত্তি অপ্রচলিত ও গেরিলা-ধাঁচের যুদ্ধে। বিপরীতে পাকিস্তানের শক্তি নিহিত তাদের প্রচলিত বাহিনী কাঠামো, উন্নত বিমান শক্তি ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতায়।

এই বাস্তবতায় সরাসরি রাষ্ট্রীয় সামরিক মুখোমুখি সংঘর্ষ কাবুলের পক্ষে সুবিধাজনক নয়। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, অস্বীকৃত বা ছায়াযুদ্ধের ক্ষেত্র থেকে প্রকাশ্য আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘাতে রূপ নেওয়ায় তালেবান সরকার এমন এক ময়দানে নেমেছে, যেখানে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বেশি এবং দীর্ঘমেয়াদে তা সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।

তবে কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগে মূল সমস্যার সমাধান হবে না বলেও মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ইসলামাবাদের প্রধান অভিযোগ ভূখণ্ড সম্প্রসারণ বা আদর্শিক প্রতিযোগিতা নয়; বরং আফগান মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালানো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি।

এই উদ্বেগকে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে আফগানিস্তানে টিটিপির (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) উপস্থিতি ও কার্যক্রমের উল্লেখ রয়েছে এবং তালেবান শাসনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের কথাও উঠে এসেছে। ফলে আন্তর্জাতিক নথিপত্রেও বিষয়টি আলোচিত।

সমস্যার সমাধান প্রতীকী পদক্ষেপে সম্ভব নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত উদ্যোগ। প্রথমত, কাবুলকে বিশ্বাসযোগ্য ও যাচাইযোগ্য উপায়ে প্রমাণ করতে হবে যে তাদের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম বন্ধে তারা কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে। শুধু অস্বীকার যথেষ্ট হবে না।

দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। গত বছরের অক্টোবরে কাতার ও সৌদি আরব উত্তেজনা প্রশমনে সহায়তা করেছিল। বর্তমানে তারা আবারও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। পাশাপাশি চীন, তুরস্ক, রাশিয়া ও ইরানও নেপথ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে।

তৃতীয়ত, উভয় দেশকেই প্রকাশ্য বক্তব্যে সংযম দেখাতে হবে। ‘উন্মুক্ত যুদ্ধ’ ঘোষণার মতো কঠোর ভাষা অভ্যন্তরীণ সমর্থন জোগালেও তা ভবিষ্যৎ সমঝোতার পথ জটিল করে তোলে। শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলেই সমাধান খুঁজতে হবে, এমনটাই মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার শঙ্কা

পাকিস্তান–আফগানিস্তান চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতির সহজ কোনো সমাধান নেই। একবার উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে তা নিজস্ব গতি তৈরি করে প্রতিটি হামলা নতুন পাল্টা হামলার জন্ম দেয়, আর কূটনৈতিক সংযমের পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে। সীমান্ত বাণিজ্য ব্যাহত হয়, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষ, যারা নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটায়। একই সঙ্গে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে উগ্রপন্থী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয় হওয়ার সুযোগও বেড়ে যায়।

টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ইসলামাবাদকে শুধু সামরিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশলগত সুবিধাকে দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতায় রূপ নিতে না দিয়ে সেটিকে কূটনৈতিক প্রভাব ও সমঝোতার সুযোগে পরিণত করতে হবে।

অন্যদিকে, কাবুলের জন্যও এই সংঘাত একটি কঠিন বার্তা বহন করছে। আফগান ভূখণ্ড সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হলে তার কৌশলগত মূল্য কতটা চড়া হতে পারে, তা বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক চাপ, সামরিক ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মিলিত প্রভাব আফগান প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পাকিস্থানের ডন সংবাদপত্রে প্রকাশিত বাকির সাজ্জাদ সৈয়দের লেখা থেকে অনুবাদিত।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নিউজনেক্সট।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *