বাংলাদেশের রাজনীতিতে যোগ হওয়া স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং নতুন করে যুক্ত হওয়া সামরিক সক্ষমতা তৈরি করেছে ভারত বাংলাদেশ কুটনৈতিক ফাটল।
শেখ হাসিনার পতনের পর থেকেই ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছিল। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির মৃত্যুর পর এন সি পি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যের পর থেকে সেই সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন , “ভারত যদি বাংলাদেশের খুনি ও নাসকতাকারীদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেয় তবে আমরাও ভারতের সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতা বাদিদের আশ্রয় দেব এবং সেভেন সিস্টার্স স্বাধীন করে দেব।”
এই বক্তব্যের পরপরই দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করে এর প্রতিবাদ জানায়। এরপর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন যদিও বলেছেন, “হাসানাত সরকারের অংশ নয়, তার বক্তব্য তার নিজস্ব। বাংলাদেশ কখনোই সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেবে না।”
ওসমান হাদির খুনি ভারতে পালিয়ে গেছে এমন খবরে ক্ষুদ্ধ বাংলাদেশের জনগণ চট্টগ্রামের ভারতীয় কনসোলে হামলা করে এবং ভারত চট্টগ্রাম অফিস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়।
ঢাকায়ও ভারতীয় দূতাবাস অভিমুখে গনযাত্রা কর্মসূচি পুশিলের বাঁধায় পথেই থেমে যায়।
একদিকে যখন ওসমান হাদির মৃত্যুতে দেশের মানুষ শোকাহত অন্যদিকে এক সনাতনী যুবক দ্বিপু দাস যিনি একজন গার্মেন্টস শ্রমিক, তাকে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে প্রথমে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় এবং পরে মৃত দেহ গাছের সাথে বেঁধে জ্বালিয়ে দেয় কিছু মানুষ।
এই নৃশংস ঘটনায় ভারতের উগ্রবাদী হিন্দু সংগঠন গুলো বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বড় উস্যু হিসেবে দেখিয়ে দিল্লিতে বাংলাদেশ দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে। এছাড়া কোলকাতার রাস্তায় বাংলাদেশ বিরোধী স্লোগান দেয়া হিন্দুত্ববাদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষের খবরও পাওয়া গেছে।
সকল প্রকার প্রশ্নকে এরিয়ে গিয়ে শুরু হয় একটার পর একটা ঘটনা, চাহিদা গিয়ে দাড়ায় কেবলই আক্রমণে।
ভারতের কেরালায় বাংলাদেশী সন্দেহে এক যুবককে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলেছে হিন্দুত্ববাদিরা। পরে জানা যায় সেই যুবক ভারতীয় নাগরিক। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাদেশী সন্দেহে গণপিটুনির খবর পাওয়া যাচ্ছে হরহামেশাই ।
এমন পরিস্থিতিতে অনেক বড় পদক্ষেপ নিয়েছে ঢাকা। দিল্লি দূতাবাসের ভিসা কার্যক্রম ও কনসোল সেবা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করা হয়েছে।
এসব বিরল কূটনীতিক ঘটনা শুধুই ওসমান হাদির মৃত্যু কিংবা দিপু দাশের মৃত্যুর ঘটনার ফলে উদ্ভুত পরিস্থিতির ফল নয়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন বাংলাদেশ একটা স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি গ্রহণ করছে যা ভারত মোটেই ভালো চোখে দেখছে না। ভারত সবসময় চায় বাংলাদেশ তার একটি অঙ্গ রাজ্যের মত বা ক্লায়েন্ট রাষ্ট্র হিসেবে থাকবে যেন সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা ও অখন্ডতা রক্ষ্যা করা যায়। অন্যদিকে পাকিস্তান ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বাংলাদেশকে ভারতের সাথে টেক্কা দেয়ার জন্য যথেষ্ট সুযোগ করে দিয়েছে।
বিশেষ করে পাকিস্তানের সাথে জয়েন্ট মিলিটারি ট্রেনিং, তুরস্কের সাথে বিশাল সামরিক চুক্তি যার মধ্যে রয়েছে মিলিটারি পাওরপ্লান্ট, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, লং রেঞ্জ মিসাইল, ড্রোন কারখানা স্থাপন ইত্যাদি। এছাড়াও ইতালির সাথে ২৯ টি ইউরোফাইটার টাইফুন ও একটি পারমাণবিক সাবমেরিন কেনার চুক্তি ভারত বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তথা অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার প্রধান কারণ।
বিগত সরকারের মতো বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভারতের জন্য চাওয়া মাত্র সুফল বয়ে আনছে না যার ফলশ্রুতিতে ভারত শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদের সাথে নিয়মিত আগ্রসন চালিয়ে যাচ্ছে।
হাদির মৃত্যু, হাসানাতের বক্তব্য কিংবা দিপু দাসের হত্যা কান্ড কেবলই ছুতো। মূল থলের বিড়াল বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও সমরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ভয় এবং সেই সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করার যত কৌশল আছে সেগুলোরই বহিঃপ্রকাশ।
সংবাদকর্মী এবং ভু-রাজনৈতিক বিশ্লেষক
