দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি শিক্ষক সমাজ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ সমাজের এক বৃহৎ অংশ বেসরকারি শিক্ষকেরা দীর্ঘদিন ধরে রয়েছেন অবহেলার শিকার। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা একই পাঠদান করেন, একই সিলেবাস অনুসরণ করেন, অথচ বেতন-ভাতা, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা সুবিধা ও অবসরকালীন প্রাপ্তিতে রয়েছে বিস্তর বৈষম্য।
এই বৈষম্যের অবসান দাবিতে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা সম্প্রতি লাগাতার আন্দোলনে নেমেছেন। তাদের দাবি বৈষম্যহীন বাড়িভাড়া, ন্যায্য বেতন বৃদ্ধি, এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদার স্বীকৃতি। দাবিগুলো অবাস্তব নয়; বরং শিক্ষাখাতের ন্যায্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠানই বেসরকারি খাতে পরিচালিত। এ বাস্তবতায় বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতি অবহেলা মানে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অবহেলা। শিক্ষক যখন নিজের অধিকার বঞ্চিত হন, তখন তাঁর কর্মে এক ধরনের হতাশা ও অনুপ্রেরণাহীনতা জন্ম নেয়। এর প্রতিক্রিয়া সরাসরি পড়ে শিক্ষার্থীর ওপর যা একটি জাতির অগ্রযাত্রার জন্য বিপজ্জনক সংকেত।
সরকার বহুবার শিক্ষক সমাজের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করলেও কার্যকর বাস্তবায়নের পথে এসেছে নানা জটিলতা। এখন সময় এসেছে এই অজুহাতের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তব সমাধান দেওয়ার। শিক্ষক মর্যাদা শুধু বক্তৃতায় নয়, নীতিতে ও বাজেটে প্রতিফলিত হওয়া চাই।
এমনিতেই করোনাকালীন সময়ের ঘাটতি তার উপর নতুন সিলেবাসের অসামঞ্জস্যতা, সেখানে শিক্ষকদের আন্দোলন ও ক্লাশ বর্জন কর্মসূচী শিক্ষাখাতকে ফেলতে অভাবনীয় সমস্যায়। যতদ্রুত সম্ভব এহেন সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে সরকারকেই।
একজন বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও চলমান আন্দোলনের একজন কর্মি হিসেবে আমি মনে করি, বেসরকারি শিক্ষক আন্দোলন দমন বা বিলম্ব নয়, বরং সংলাপ ও সম্মানের মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। শিক্ষা হলো জাতির মেরুদণ্ড, আর শিক্ষক সেই মেরুদণ্ডের রক্ষক। এই রক্ষকের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করা মানে নিজেদের ভবিষ্যৎকেই দুর্বল করা।
সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীর বাড়ী ভাড়া যেখানে মূল বেতনের ৪৫% সেখানে মাত্র ২০ শতাংশ (ন্যূনতম ৩ হাজার টাকা) বাড়িভাড়া, ১৫০০ চিকিৎসা ভাতা ও কর্মচারীদের ৭৫% উৎসব ভাতার দাবিতে টানা পাঁচ দিন ধরে রাস্তায় আন্দোলন করছেন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। ১২ অক্টোবর শুরু হওয়া এ আন্দোলন কখনো জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তায়, কখনো কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে, কখনো হাইকোর্টের সামনের সড়কে কখনো বা শাহবাগ ব্লকেডের মতো কর্মসূচি পালন করছেন তারা। কর্মসূচীর এহেন ধারাবাহিকতায় আজ দুপুরের পর দাবি পূরণ করে প্রজ্ঞাপন জারির দাবিতে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচী পালন করে আন্দোলরত শিক্ষক কর্মচারীরা। দাবী আদায় না হলে মার্চ টু যমুনার ঘোষণা দেন শিক্ষক নেতারা।
ঠিক একই দাবিতে সারা দেশে সকল এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মবিরতিও চলছে তৃতীয় দিনের মতো।এমন পরিস্থিতিতে সৃথবির হয়ে পড়েছে বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা।বার্ষিক পরীক্ষার খুব কাছাকাছি সময়ে এসে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে চলমান আন্দোলনে শিক্ষকদের যেমন কষ্ট হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষকেও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।যদিও এমন পরিস্থিতির জন্য সাধরাণ মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়ে এর দায় সরকারকেই দিচ্ছেন তারা।
এমন পরিস্থিতিতেও সরকারের পক্ষ থেকে তা সমাধানে গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।যদিও শাহবাগে ব্লকেড কর্মসূচীতে সরকারের লিঁয়াজো সদস্য ‘গণ সংহতি আন্দোলন’র প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি ও এবি পার্টি’র সভাপতি মজিবুর রহমান মন্জুকে ভুয়া ভুয়া বলে প্রত্যাখ্যান করে অভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীরা।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়িভাড়ার ভাতা মাত্র ৫০০ টাকা বাড়ানোর বিষয়ে অর্থ বিভাগের সম্মতিপত্র প্রকাশের পর শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে। তাঁদের ভাষ্য, এই ‘সামান্য’ ভাতা বৃদ্ধি শিক্ষকদের জন্য লজ্জার।
এখন শিক্ষক-কর্মচারীদের অন্য দুটি দাবি হলো উভয়ের জন্য চিকিৎসা ভাতা দেড় হাজার টাকা এবং কর্মচারীদের উৎসব ভাতা ৭৫ শতাংশ করা।
শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরারের আমন্ত্রণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যান জাতীয়করন প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসন আজিজি। পরে দেখা করে এসে কাঁদতে কাঁদতে যেভাবে প্রেস ব্রীফ করলেন তা দেখে পুরো বাংলাদেশ কেঁদেছে!যে কান্না শুরু হয়েছিল ১২ অক্টোবরের প্রেসক্লাবের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে শিক্ষকদের উপর পুলিশের লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটানো,লাথি, কিল,ঘুষি,চড় থাপ্পড় ও কলার ধরে নিয়ে গিয়ে আটক করার মতো অবস্থায়।পরে অবশ্য পরিস্থিতি আঁচ করে আটককৃত হতভাগা শিক্ষক দের ছেড়ে দেয় পুলিশ।এসব দেখে মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আসার সখ কড়াই গন্ডাই মিটে গেছে।
স্বাধীনতার ৫৪ বছরে এসেও শিক্ষকদের সাথে সরকারি পেটুয়া বাহিনী ও উপদেষ্টাসহ আমলাদের এমন বিমাতাসূলভ আচরণ জাতির কপালে এঁকেছে এক কলংকের ইতিহাস।
কবি কাজী কাদের নওয়াজ বেঁচে থাকলে হয়তো লিখতেন, আজ থেকে চির অবনত হলো গুরুর শির!
