বাংলাদেশ আবারও একটি বড় বাজেট পেল। প্রায় ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার এই বাজেট কেবল একটি অর্থনৈতিক দলিল নয়, বরং রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার প্রতিফলন। কাগজে-কলমে এটি এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন হলো, এই বাজেট কতটা মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারবে?
বাজেট আসলে একটি অদ্ভুত দলিল। এতে মানুষের হাসি-কান্না থাকে না, থাকে শুধু সংখ্যা। অথচ সেই সংখ্যাগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে মানুষের প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধ চালের দাম, ভাড়ার চাপ, সন্তানের স্কুলের ফি, কিংবা এক টুকরো স্বস্তির প্রত্যাশা।
প্রথমেই আসা যাক সামষ্টিক চিত্রে। সরকার প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৬.৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭.৫ শতাংশে আনার লক্ষ্য নিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রবণতা বলছে, এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। গত কয়েক বছরে বিনিয়োগের গতি মন্থর, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, এবং ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও খেলাপি ঋণের বোঝা বেড়েছে। ফলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যটি অনেকাংশেই নীতিগত আশাবাদ, বাস্তব নিশ্চয়তা নয়।
এই বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সংখ্যা কি মানুষের অনুভূতি বোঝে? মূল্যস্ফীতির হার যদি সাত শতাংশ হয়, আর মানুষের আয় যদি ততটা না বাড়ে, তবে সেই সাত শতাংশই হয়ে উঠবে তার প্রতিদিনের অস্বস্তির পরিমাপ।
অন্যদিকে, বাজেটের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আহরণ। প্রায় ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। করদাতার সংখ্যা সীমিত, প্রত্যক্ষ করের অংশ কম, এবং পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা বেশি, যা সাধারণ মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ সৃষ্টি করে। কর প্রশাসনে ডিজিটালাইজেশন ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর কথা বলা হলেও, বাস্তবায়নের গতি এখনো সন্তোষজনক নয়।
ঘাটতি বাজেটও একটি বড় বাস্তবতা। প্রায় ২.৪৩ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি পূরণে সরকারকে নির্ভর করতে হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর। অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়লে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যাকে অর্থনীতির ভাষায় ‘ ক্লাউডিং আউট’ বলা হয়। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণ বাড়লে ভবিষ্যতে ঋণপরিশোধের চাপ এবং মুদ্রার বিনিময় হার অস্থির হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে এবারের বাজেট বেশ উচ্চাভিলাষী। অবকাঠামো, জ্বালানি, যোগাযোগ ও সামাজিক খাতে বড় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো উন্নয়ন প্রকল্পে সময়ক্ষেপণ, ব্যয় বৃদ্ধি এবং কার্যকারিতার ঘাটতি একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। প্রকল্প গ্রহণের চেয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতেও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন ভাতা কর্মসূচি সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই সহায়তা কি মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট? যখন খাদ্য, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে, তখন সামান্য নগদ সহায়তা অনেক সময় বাস্তব স্বস্তি দিতে পারে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন চাকরি সৃষ্টি হচ্ছে না। বাজেটে শিল্পায়ন, এসএমই খাত এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের কথা বলা হলেও, সুনির্দিষ্ট নীতি ও দ্রুত বাস্তবায়ন ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন।
ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত সংস্কারের প্রশ্নটিও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি এবং সুশাসনের অভাব অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। বাজেটে এই খাতের সংস্কারের ইঙ্গিত থাকলেও, কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
সবশেষে, এই বাজেটের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। এটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেট অতএব এটি একদিকে যেমন অর্থনৈতিক নীতির প্রতিফলন, অন্যদিকে জনগণের কাছে আস্থার পরীক্ষা। বাজেটে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি আছে, বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা আছে, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের বার্তা আছে; কিন্তু বাস্তবায়নই শেষ পর্যন্ত সবকিছুর মাপকাঠি।
সব মিলিয়ে বলা যায় এবারের বাজেট বড় কিন্তু বড় হওয়াই যথেষ্ট নয়। একটি ভালো বাজেট সেই যে মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনে, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করে, এবং ভবিষ্যতের জন্য টেকসই ভিত্তি তৈরি করে।
এখন দেখার বিষয়, এই বাজেট সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে কিনা নাকি এটি কেবল আরেকটি উচ্চাভিলাষী ঘোষণা হিসেবেই থেকে যাবে।
– নির্বাহী সম্পাদক, নিউজনেক্সট / ranawithu@gmail.com
