বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই বদলে যায় বাংলাদেশের চিত্র। পাড়া-মহল্লা, শহর থেকে গ্রাম—সবখানে উড়তে থাকে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা। রাত জেগে কোটি মানুষ টেলিভিশনের সামনে বসে উপভোগ করেন ফুটবলের মহাযজ্ঞ। প্রিয় দলের জয়-পরাজয়ে আবেগে ভাসেন সমর্থকেরা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় যে দেশে ফুটবল নিয়ে এত উন্মাদনা, সেই দেশের নিজস্ব ফুটবল কেন এখনো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পিছিয়ে?
বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাস একেবারে ম্লান নয়। আশির দশক ও নব্বইয়ের শুরুতে দেশের ঘরোয়া ফুটবলের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। আবাহনী লিমিটেড ঢাকা ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ঢাকা–এর মতো ক্লাবগুলোর ম্যাচ দেখতে স্টেডিয়ামে দর্শকের ঢল নামত। জাতীয় দলের খেলাতেও ছিল ব্যাপক আগ্রহ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেনি দেশের ফুটবল।
অবকাঠামোর সংকট
ফুটবলে উন্নতির প্রথম শর্ত হলো তৃণমূল পর্যায়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পর্যাপ্ত মাঠ। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো খেলাধুলার অবকাঠামোর অভাব।
শহরগুলোতে খেলার মাঠ কমে যাচ্ছে, আর গ্রাম পর্যায়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে বের করার কার্যকর ব্যবস্থা সীমিত। অনেক সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় ছোট বয়সেই ফুটবল ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যান, কারণ দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়ার নিশ্চয়তা তারা পান না।
বিশ্বের শীর্ষ ফুটবল দেশগুলোতে শিশুদের বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণ, একাডেমি ও নিয়মিত প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশে সেই কাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়।
তৃণমূল থেকে খেলোয়াড় তৈরি না হওয়া
আন্তর্জাতিক ফুটবলে সফল দেশগুলোর মূল শক্তি তাদের যুব উন্নয়ন ব্যবস্থা। ছোট বয়স থেকেই খেলোয়াড়দের প্রযুক্তিগত দক্ষতা, শারীরিক সক্ষমতা ও কৌশল শেখানো হয়।
বাংলাদেশে অনেক সময় জাতীয় দলের জন্য খেলোয়াড় খোঁজা হয় তুলনামূলক বেশি বয়সে। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা তৈরি হওয়ার সুযোগ কমে যায়।
ঘরোয়া ফুটবলের দুর্বলতা
একটি শক্তিশালী জাতীয় দলের জন্য প্রয়োজন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ঘরোয়া লিগ। বাংলাদেশে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ ফুটবল থাকলেও এর মান, নিয়মিত আয়োজন এবং দর্শক সম্পৃক্ততা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে।
অনেক ক্লাব আর্থিক সমস্যায় ভোগে। ভালো মানের বিদেশি খেলোয়াড় ও কোচ আনার সক্ষমতাও সীমিত। ফলে স্থানীয় খেলোয়াড়েরা উচ্চমানের প্রতিযোগিতার সুযোগ কম পান।
ফুটবলের বদলে ক্রিকেটের আধিপত্য
বাংলাদেশে ফুটবল জনপ্রিয় হলেও গত দুই দশকে ক্রিকেট দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বড় জায়গা দখল করেছে। জাতীয় ক্রিকেট দলের সাফল্য, আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও বাণিজ্যিক আকর্ষণের কারণে বিনিয়োগ ও গণমাধ্যমের মনোযোগ ক্রিকেটের দিকে বেশি গেছে।
ফুটবলের সমর্থক অনেক হলেও সেই আবেগকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কাঠামোয় রূপ দেওয়া যায়নি।
পরিকল্পনার অভাব
বিশ্ব ফুটবলে সফল দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোয়। খেলোয়াড় তৈরি, কোচ উন্নয়ন, বয়সভিত্তিক দল, আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি—সবকিছু একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও ধারাবাহিকতা ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফুটবল উন্নয়নে প্রয়োজন কয়েক বছরের নয়, কয়েক দশকের পরিকল্পনা।
পরিবর্তনের সুযোগ কোথায়?
বাংলাদেশের ফুটবলে সম্ভাবনা নেই—এ কথা বলা যাবে না। দেশের তরুণদের মধ্যে ফুটবলের প্রতি আগ্রহ এখনো প্রবল। প্রয়োজন সেই আগ্রহকে সঠিক পথে ব্যবহার করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলা পর্যায়ে নিয়মিত লিগ, স্কুল ফুটবলের বিস্তার, আধুনিক প্রশিক্ষণ একাডেমি, দক্ষ কোচ তৈরি এবং ক্লাব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে পারলে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব।
