যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্বের সকল এয়ারলাইন মুহূর্তের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিজেদের নাগরিক ও ক্রুদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার অভিযান শুরু করে। অথচ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সেই মুহুর্তে নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকায় দাড়িয়ে রয়েছে। প্রতিদিনই গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর আসছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হাজারো যাত্রী আটকা পড়ে আছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিরা অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। তাদের পরিবারগুলো আতঙ্কে প্রহর গুনছেন।
অথচ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস একেবারই চুপ করে বসে রয়েছে। যা চরম নিষ্ঠুরতার শামিল। তবে এই পরিস্থিতিতে বসে থাকেনি বাংলাদেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউএস বাংলা এয়ারলাইনস। তারা হিসেব করতে বসেনি কে বিমানের ক্রু আর কে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ক্রু। বিমানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হয়েও উদ্ধার অভিযানে নেমে পড়েছে ইউ-এস বাংলা এয়ারলাইনস। বিমানের এ ধরনের উদাসিনতাকে শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রবাসীদের পরিবার অভিযোগ করে বলছেন, দেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড হিসেবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্মান করা হলেও এ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তার ব্যাপারে খুব বেশি অবহেলা করা হচ্ছে। তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে সরকার ও বিমান কেউ কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না। সরকারের এ সিদ্ধান্তহীনতায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। দেশে তাদের পরিবারগুলো উৎকণ্ঠা ও নির্ঘুম রাত কাটালেও বিমানের পক্ষ থেকে এ সংকটে তেমন জরুরি প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আকস্মিক বিমান হামলায় ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মধ্য দিয়ে সংঘাতের সূত্রপাত হয়। এরপর উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষেপনাস্ত্র ও বোমাবর্ষণ শুরু হয়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ইরান কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলি অবস্থান লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ঘটে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ। বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুজন বাংলাদেশি নিহত এবং বাহরাইন ও কুয়েতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আরও সাতজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
যুদ্ধের পাঁচ দিন পরও বিমান শুধু আটকা পড়া যাত্রীদেরই নয়, নিজেদের দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ (সংযুক্ত আরব আমিরাত), দাম্মাম (সৌদি আরব) এবং দোহা (কাতার)-এ অবস্থানরত ক্রু সদস্যদেরও উদ্ধার করতে পারেনি। আঞ্চলিক আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এর বিপরীতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। সংস্থাটি আটকা পড়া যাত্রীদের, বিশেষ করে যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে, তাদের উদ্ধারের জন্য ঢাকা-দুবাই-ঢাকা রুটে বুধবার ও বৃহস্পতিবার দুটি বিশেষ মানবিক ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দেয়।
এদিকে বিমান নিজের কর্মীদের উদ্ধারে বেসরকারি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়। অভ্যন্তরীণ চিঠিপত্রে দেখা যায়, দুবাই অফিস ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ইউএস-বাংলার মানবিক ফ্লাইটে নিজেদের ২৭ জন ক্রু সদস্যের জন্য আসন বুকিংয়ের অনুমতি চেয়েছে। বুধবার দুপুরের ফ্লাইটের জন্য প্রতিটি টিকিটের মূল্য ধরা হয় ১,৬৫০ দিরহাম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম তিন দিনে মধ্যপ্রাচ্যগামী এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে ১২,৯০০টিরও বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশে মধ্যপ্রাচ্যগামী প্রায় ১৫০টি ফ্লাইট স্থগিত বা বাতিল হয়, ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরে অসংখ্য যাত্রী, যাদের বেশিরভাগই প্রবাসী শ্রমিক, আটকা পড়েন। তবে দাম্মাম, দোহা, দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ ও কুয়েতগামী বিমানের ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ নোটিশ’ জারি করে বিমান বাংলাদেশ। যাত্রীদের বিক্রয় অফিস বা ট্রাভেল এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয় এবং তথ্যের জন্য দুটি হটলাইন নম্বর (১৩৬৩৬ ও +৮৮০৯৬১০৯১৩৬৩৬) দেওয়া হয়।
বিভিন্ন এয়ারলাইনস এর অফিসিয়াল সূত্র থেকে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের এ যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রথমদিন থেকেও বিশ্বের সকল এয়ারলাইনস নিজেদের নাগরিক ও ক্রুদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে শুরু করে। যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ২ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তাদের ক্রুদের সফলভাবে ফিরিয়ে আনে। তারা ওমানের মাসকাটে একটি খালি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার পাঠিয়ে সেখান থেকে ক্রুদের দেশে আনে।
ভারতও দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। ইতিহাদ এয়ারওয়েজ এর চারটি বিশেষ ফ্লাইট ২ মার্চ ভারতের বিভিন্ন শহরে পৌঁছায়। এছাড়া এয়ার ইন্ডিয়া দুবাই থেকে ১৪৯ জন যাত্রীকে নয়াদিল্লিতে নিয়ে আসে এবং ইন্ডিগো জেদ্দা থেকে দশটি বিশেষ ফ্লাইটের ঘোষণা দেয়।
বৈঠক হলেও তৎপরতার অভাব
বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী আফরোজ খানম রিতা চলমান পরিস্থিতি নিয়ে গত মঙ্গলবার এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। সেখানে ফ্লাইট চালু হলে মেয়াদোত্তীর্ণ বা প্রায় মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসাধারী যাত্রীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং অতিরিক্ত ভাড়া না নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
তবে বৈঠকে তাৎক্ষণিক উদ্ধার অভিযান নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অভ্যন্তরীণ বৈঠকে ছয়টি উপসাগরীয় গন্তব্যে ফ্লাইট স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয় এবং বিকল্প হিসেবে মাসকাট বিমানবন্দর ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেদের ক্রুদের উদ্ধারে ইউএস-বাংলার ফ্লাইটে আসন কেনার সিদ্ধান্তই কার্যত একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায়।
