জামশেদ নাজিম— একজন মানুষের নাম নয়, বরং ভেঙে যাওয়া এক হৃদয়ের দীর্ঘ আর্তনাদ। যে মানুষটি শব্দকে ব্যবহার করেন আত্মরক্ষার শেষ অস্ত্র হিসেবে, যেখানে নীরবতা ব্যর্থ হয়, সেখানে তাঁর কলম কথা বলে। তাঁর লেখা আদৌ কবিতা কিনা— সে প্রশ্নের নিষ্পত্তি তিনি নিজে করেন না। এই লেখাগুলো কোনো সৌন্দর্যের প্রদর্শনী নয়, এগুলো ভাঙনের দলিল, অধিকারহীন ভালোবাসার স্বীকারোক্তি, আর অনুভব হারিয়ে ফেলার নির্মম ইতিহাস।
জামশেদ নাজিম বিশ্বাস করেন— সব লেখা কবিতা হতে চায় না, কিছু লেখা শুধু বেঁচে থাকার প্রমাণ হতে চায়। তাঁর শব্দে ছন্দের চেয়ে বেশি আছে শ্বাস, উপমার চেয়ে বেশি আছে ক্ষত, আর অলংকারের চেয়ে বেশি আছে সত্য।
এই লেখাগুলো পড়তে গিয়ে পাঠক যদি অস্বস্তিতে পড়েন, যদি কোথাও থমকে যান, যদি নিজের ভেতরের কোনো নীরবতাকে চিনে ফেলেন— তাহলেই এই লেখার সার্থকতা।
শেষ শব্দ লেখা পর্যন্ত কথাগুলো কবিতা কি না— সে বিচারের ভার লেখক নেন না। তিনি শুধু দাঁড়িয়ে থাকেন ভাঙা হৃদয় হাতে,পাঠকের চোখের দিকে তাকিয়ে— নিঃশব্দ, কিন্তু নির্ভীক।
আমি চুপ থাকি
আমি চুপ থাকি—
কারণ শব্দ উচ্চারণ করলেই
আমার জিহ্বা আদালতে দাঁড়ায়,
প্রতিটি বাক্য সাক্ষ্য দেয়
আমারই বিরুদ্ধে।
আমি জানি—
একটা প্রশ্ন করলেই অপরাধ,
একটু দাবি করলেই দোষী সাব্যস্ত,
আর ভালোবাসার নাম নিলেই
ফাঁসির রায় লেখা হয়ে যায়।
এই নীরবতা কোনো শান্তির আশ্রয় নয়—
এটা গলার ভেতর জমে থাকা
না-বলা স্বীকারোক্তির কবর।
শ্বাস নিলেই বুকের ভেতর
অশ্রুত কান্না খচখচ করে ওঠে,
কণ্ঠনালিতে আটকে যায়
সব সত্য, সব আর্তি।
আমি চুপ থাকি—
কারণ এখানে ব্যথার ভাষা নেই,
আছে শুধু সহ্য করার ব্যাকরণ।
যেখানে কষ্ট প্রকাশ করলে
নাটক বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়,
আর ভেঙে পড়লেই
প্রমাণ চাই—
কেন ভাঙলে।
নীরব হয়ে থাকাটা অভ্যাস নয়,
এটা আত্মরক্ষার শেষ পদ্ধতি।
আমি শব্দ বাঁচাই—
কারণ শব্দগুলো বেরোলেই
আমার সমস্ত অন্ধকার
একসাথে আলো হয়ে যাবে,
আর আলো এখানে
সবচেয়ে বড় অপরাধ।
তাই আমি চুপ থাকি।
এই চুপ করে থাকা
আমার বিরুদ্ধে নয়—
আমার বেঁচে থাকার পক্ষে
নীরব, তীক্ষ্ণ
একটা শেষ স্বীকারোক্তি।
শেষ কথা
এখন আর কষ্ট নেই?
না— ঠিক তা নয়।
কষ্ট পাওয়ার মতো অনুভব
আমার ভেতরে আর জীবিত নেই।
হৃদয়ের যে ঘরটায়
তোমার নাম একদিন
আত্মার মতো ঝুলে ছিল,
সেখানে এখন
শূন্যতার অকেজো তালা,
আর নীরবতার দীর্ঘশ্বাস।
ভালোবাসা ছিল,
দাবি করার মতো শক্তি ছিল না।
ছোঁয়া ছিল,
ছুঁয়ে থাকার অধিকার নয়।
আমি নীরবে অপেক্ষা করেছি,
আমাকে শেখানোই হয়েছিল—
ভালোবাসা মানেই
নিজের প্রিয় অধ্যায় মুছে ফেলা।
তুমি অবশ্য এসেছিলে,
হালকা আলো হয়ে।
আমি ভেবেছিলাম
এই আলোতেই বুঝি
আমার অন্ধকার শেষ হবে।
অথচ আলোটা ছিল ধার করা,
আর অন্ধকারটা—
আমার নিজের, চিরস্থায়ী।
আমি কখনো বলিনি, “থাকো।”
জানতাম,
যেখানে অধিকার নেই
সেখানে অনুরোধ
নিজেকে অপমান করার আরেক নাম।
আমি নীরব থেকেছি,
সত্য বলতে— নীরবতাই ছিল
আমার একমাত্র মর্যাদা।
ধীরে ধীরে, আমি ভুলে গেছি
কীভাবে কাঁদতে হয়,
কীভাবে অভিমান জমাতে হয়।
হৃদয়টা শিখে নিয়েছে
শূন্য থাকার নির্মম শিল্প—
যেখানে অনুভব মরলে
কেউ খোঁজ নেয় না।
আজ আর ব্যথা লাগে না।
কারণ ব্যথা মানেই অনুভব,
আর অনুভব করার জায়গাটাই
অনেক আগেই
ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
ভালোবাসা ছিল, অধিকার ছিল না—
এই এক লাইনের ভেতরেই
আমার পুরো জীবন
নিঃশব্দে শেষ হয়ে গেছে।
আর এই গল্পের শেষে
কাউকে হারাইনি,
আমি শুধু
নিজেকেই আর খুঁজে পাই না।
শূন্যতার আগুন
হঠাৎ একদিন,
অসহ্য ক্লান্তি বুকে নিয়ে
মাথা ঠেকালাম
শূন্যতার দরজায়।
সে কিছু জিজ্ঞেস করল না,
হাসল না,
ভালোবাসল না—
শুধু তাকিয়ে রইল,
অমানবিক নীরবতার মতো।
তবু,
সে আমাকে গ্রহণ করল।
ভয়ংকর নীরবতায়
ধীরে ধীরে আমাকে ভেঙে দিল,
কোনো প্রতিশ্রুতি নয়,
কোনো ছলনা নয়,
শুধু নির্মম সত্য,
যে সত্যে কোনো মায়ার ছায়া
ছুঁতে সাহস পায় না।
তোমার তুলনায়—
শূন্যতা অনেক বেশি নিষ্ঠুর,
আর অনেক বেশি সৎ।
সে অন্তত ভান করে না।
শুধু থাকে,
অন্ধকারের নিঃশ্বাসের মতো।
আমার ভাঙা হৃদয়কে
জ্বালিয়ে দেয়,
পোড়ায়,
তবু কখনো
একটা মিথ্যা আশ্বাস দেয় না।
এখানেই তুমি হারিয়ে যাও—
অহংকারের মলিন খেলায়,
দৃষ্টিহীন ভালোবাসার ভিড়ে।
আর শূন্যতার নীরব আগুন
আমার কানে কানে বলে—
“আমি খালি,
তবু এই খালি আমাকে
কেউ ভাঙতে পারে না।
তুমিও পারো না।”
অগ্নিধ্বংসের নীরবতা
আচ্ছা, শেষমেশ কোন কবি
কোথায় বসে লিখেছেন
অসুস্থ পৃথিবীর বিদ্রোহের কবিতা?
মাটির পাঁজরে আগুন,
অন্ধকারে পুড়ে
মানুষের ছায়া উড়ে যায়।
শরীর ছাই হয়,
বাতাসে মিশে যায়
নামহীন মৃত্যু।
রঙিন স্বপ্নগুলো
ঘৃণার নখে ছিঁড়ে যায়।
আজ বৈধতার ছায়া—
নীরব হত্যার নির্লজ্জ সাক্ষী।
কোনো কান শোনে না,
কোনো চোখ দেখে না।
শুধু চিৎকারের কঙ্কাল
মাটির ভেতর পুঁতে রাখা হয়।
শেষ কবি কোথায় বসবেন?
এই আগুন কি শুধু দেখবে,
নাকি শব্দ ছুরির মতো ধারালো হয়ে
ধ্বংসের দলিল লিখে দেবে?
এই যে, আমার দেশের রাজনীতি—
নিস্তব্ধ এক কবরখানা।
অবক্ষয় আর প্রতিযোগিতার
দুর্গন্ধে ভরা।
কেউ আজ কবিতা লেখে না,
একটা ফেসবুক স্ট্যাটাসই
অদৃশ্য আদালতের রায় বদলে দেয়।
কোনো কবিতায় আজ
দেশের টান নেই,
মায়ের আঁচলের গন্ধ নেই।
শূন্য চোখে শুধু
স্তম্ভহীন মাতৃভূমি, ছিন্নভিন্ন।
শব্দ ভেঙে পড়েছে।
ধ্বংসের নিঃশ্বাসে
কবিতার ফুসফুস পচে গেছে।
কবিতা আর জাগায় না—
শুধু আগুনে পুড়ে যাওয়া
হৃদয়ে ঠোঁট ছোঁয়।
শেষ কবি কোথায় বসবেন?
নাকি আমরা শুধু দেখব—
নিঃশব্দ আগুনে ছড়িয়ে থাকা
নিশ্বাসহীন ধ্বংসের ছবি?
হাসির কাছে আত্মসমর্পণ
তোমার হাসিটা দেবে?
ধার নয়—
জানো তো, ধার নিলে ফেরত দিতে হয়,
আর আমি এখন এমন এক মানুষ
যার কাছে ফেরত দেওয়ার মতো
কিছুই অবশিষ্ট নেই।
চুরি নয়—
চোরেরা অন্তত পালাতে পারে।
আমার পালাবার কোনো দিক নেই,
সব রাস্তা শেষ হয়ে গেছে
এই বুকের ভেতরেই।
প্রয়োজনে ছিনিয়ে নেবো—
হ্যাঁ, ছিনিয়ে।
নখের নিচে মাংস ঢুকে যাওয়া পর্যন্ত,
রক্তে ভেজা
এক মুহূর্তের জন্য।
কারণ এই বুকটা
এখন আর ভালোবাসা বোঝে না।
এটা বোঝে শুধু—
কীভাবে বাঁচতে গিয়ে
প্রতিদিন একটু একটু করে
নিজেকে কবর দিতে হয়।
এই বুক আর সহ্য করতে পারে না
অন্ধকারের দীর্ঘ স্বৈরশাসন।
ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসগুলো
এখন আলো চায় না—
চায় আগুন,
রক্তের মতো দগ্ধ করা
নির্মম সত্য।
আমি জানালা খুলবো না,
ভেঙে ফেলবো।
ঝড় এলে বুকের হাড়ে আঘাত করুক,
বৃষ্টি এলে স্মৃতির কবর
ভাসিয়ে নিয়ে যাক।
আজ হৃদয়ের ধ্বংসই
আমার একমাত্র মুক্তির যুদ্ধ।
তোমার চোখে তাকালেই
আমি উলঙ্গ হয়ে যাই—
সেখানে দেখি
নিজের সাজানো সাহসের লাশ,
আত্মসম্মানের নামে
দীর্ঘদিন লুকিয়ে রাখা
আমার কাপুরুষতার ইতিহাস।
এই চোখ দু’টোকে
আমি কখনো ভয় পাইনি।
আমি ভয় পেয়েছি
নিজেকে চিনে ফেলার মুহূর্তটাকে।
এখন খুব ধীরে,
শ্বাসের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে
ফিসফিস করে স্বীকার করি—
আমি আগে কখনোই তাকাইনি,
জানতাম, তোমার চোখে তাকালে,
আমার ভাঙনটাই
সবচেয়ে নির্মম সত্য হয়ে উঠবে।
হাসিটাই দাও—
হয়তো সেই এক মুহূর্তেই
আমি নিজেকে হারিয়ে
আরও একবার
মানুষ হয়ে ফেরার সাহস পাবো।
