বাংলা কবিতার সাম্প্রতিক প্রবাহে এমন কিছু কাব্যগ্রন্থ আসে, যেগুলো কেবল পাঠের বস্তু হয়ে থাকে না; বরং পাঠককে একটি স্বতন্ত্র আবহের মধ্যে টেনে নেয়। কবি মাহমুদুল হক ইফতির ‘ধুতুরা ফুলের বিকাল’ তেমনই এক কাব্যভুবন যেখানে বিষণ্নতা আছে, কিন্তু তা নিছক হতাশার নয়; প্রেম আছে, কিন্তু তা শরীরী আবেগের সীমায় আটকে থাকে না; স্মৃতি আছে, কিন্তু তা কেবল অতীতচর্চা নয়, বরং অস্তিত্বের এক অনিবার্য পুনর্নির্মাণ।
গ্রন্থটির নামেই যে বিপরীতধর্মী আবহ নির্মিত হয়েছে ‘ধুতুরা’, যা বিষাক্ত অথচ মোহময়; আর ‘বিকাল’, যা দিনশেষের নরম আলোয় স্মৃতির ভিতর ডুবে যাওয়ার সময়—এই দ্বৈততা পুরো বইজুড়ে ছড়িয়ে আছে। কবি যেন বিষ ও সৌন্দর্য, ক্ষয় ও আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি ও বিস্মৃতির মধ্যবর্তী এক অনিশ্চিত ভূগোল নির্মাণ করেছেন।
বইটির কবিতাগুলোর ভাষা প্রথমেই আকর্ষণ করে তার চিত্রকল্পের গভীরতা দিয়ে। কবি প্রকৃতি, নগর, শরীর, আকাশ, বৃষ্টি, সন্ধ্যা এসব পরিচিত অনুষঙ্গকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে তা কেবল দৃশ্যমান থাকে না, বরং অনুভবের পরত হয়ে ওঠে। যেমন এক জায়গায় তিনি লিখেছেন—
“অন্ধকার নেমে এলে শহরে ফোটে অবিরাম রাত্রিফুল” এখানে ‘রাত্রিফুল’ কেবল ফুল নয়; এটি নিঃসঙ্গতারও রূপক, এক নিঃশব্দ বিস্ফোরণ, যা নগরের অন্ধকারে অদৃশ্যভাবে ফুটে ওঠে।
আবার প্রেমের অভিব্যক্তিও এই বইয়ে সরল স্বীকারোক্তির ভঙ্গিতে আসে না; বরং তা অনুপস্থিতির বেদনাকে ধারণ করে। কবি লিখছেন “কখনো বিদায় বলা হবে না আমাদের / কারণ আমাদের হয়নি বলা স্বাগতম, প্রিয়!”
এই পঙ্ক্তিতে সম্পর্কের এক অনিবার্য অসম্পূর্ণতা ধরা পড়ে। প্রেম এখানে প্রাপ্তির চেয়ে অনেক বেশি প্রতীক্ষার, সম্ভাবনার, না-ঘটা ভবিষ্যতের।
গ্রন্থটির বড় শক্তি এর স্মৃতিচর্চার অভিনবতা। বাংলা কবিতায় স্মৃতি অনেকবার ফিরে এসেছে; কিন্তু এখানে স্মৃতি সরাসরি নস্টালজিয়ার আশ্রয় নেয় না। বরং তা এক অস্থির প্রশ্ন হয়ে ওঠে। যেমন— “পুরোনো ডায়েরির পাতা / টাইম ট্রাভেল / ঘর গোছাতে গিয়ে”
এই সংক্ষিপ্ত উচ্চারণেই কবি দেখিয়েছেন, স্মৃতি কখনো কখনো গোছানো জীবনের ভিতর আচমকা খুলে যাওয়া এক গোপন দরজা।
কবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তাঁর ধ্বনি ও ছন্দের ওপর দখল। অধিকাংশ কবিতাই মুক্তছন্দে লেখা, কিন্তু কোথাও তা গদ্যকবিতার আলগা স্বর হয়ে যায়নি। বরং শব্দের অভ্যন্তরীণ অনুরণন কবিতাগুলোকে সংগীতময় করেছে। যেমন— “আলো হয়ে ফুটবি / ছুঁয়ে দিস তুই—আলো, গাছ হয়ে যাই”
এই পঙ্ক্তিগুলোতে এক ধরনের অন্তর্লীন সুর আছে, যা পাঠের পরও কানে থেকে যায়।
তবে বইটির সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক সম্ভবত তার মেটাফিজিক্যাল আবহ। অনেক কবিতায় মনে হয়, কবি দৃশ্যমান জগতের আড়ালে আরেকটি গোপন বাস্তবতার অনুসন্ধান করছেন। দেবী, আকাশ, আলো, নদী, আগুন—এসব চিহ্ন বারবার ফিরে আসে এক আধ্যাত্মিক অভিযাত্রার ইঙ্গিত নিয়ে। যেমন— “দেবী নেমে আসে সন্ধ্যায়, দেবী ডুবে যায় জলে”
এই ধরনের পঙ্ক্তি পাঠককে কেবল দৃশ্য কল্পনা করতে বলে না; বরং অনুভবের এক অলৌকিক স্তরে নিয়ে যায়।
তবে কিছু কবিতায় চিত্রকল্পের ঘনত্ব এত বেশি হয়ে উঠেছে যে পাঠকের কাছে তা দুর্বোধ্যতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কোথাও কোথাও কবি ইমেজের প্রাচুর্যে বক্তব্যকে আড়াল করেছেন। কিন্তু সেটিও হয়তো এই কাব্যের নান্দনিক প্রকল্পের অংশ—সব কিছু স্পষ্টভাবে বলে না দিয়ে অনুভবের জন্য কিছু ফাঁক রেখে দেওয়া।
সব মিলিয়ে, ‘ধুতুরা ফুলের বিকাল’ সমকালীন বাংলা কবিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এটি এমন এক কাব্যগ্রন্থ, যা একবার পড়ে শেষ করা যায় না; বারবার ফিরে আসতে হয়, নতুন আলোয়, নতুন অন্ধকারে। এই বইয়ের কবি নিঃসন্দেহে ভাষার সঙ্গে গভীর আত্মীয়তা রাখেন এবং তাঁর কাব্যিক জগৎ পাঠককে দীর্ঘ সময় তাড়া করে ফেরে।
শেষ পর্যন্ত এই বই যেন নিজেই তার পরিচয় দিয়ে বলে ওঠে— “আমরা দগ্ধ-সংঘ, / খুন হই ভালোবেসে / না-ভালোবেসেও…”
এই স্বীকারোক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে পুরো কাব্যগ্রন্থের সারমর্ম—ভালোবাসা, ক্ষয়, স্মৃতি, বিষাদ এবং তাদের অতিক্রম করে বেঁচে থাকার এক অনিবার্য কবিতা।
উল্লেখ্য, কবি মাহমুদুল হক ইফতির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নস্টালজিক মেঘদল’ প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালে।
