পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে মাইন স্থাপন শুরু করেছে ইরান এমন দাবি করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে পরিচিত দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালিতে সীমিত পরিসরে মাইন স্থাপন করা হয়েছে।
সূত্রগুলো জানায়, এখন পর্যন্ত খুব বড় আকারে মাইন বসানো হয়নি। গত কয়েক দিনে মাত্র কয়েক ডজন মাইন স্থাপন করা হয়েছে। তবে ইরানের ছোট নৌকা ও মাইন স্থাপনকারী জাহাজগুলোর প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ এখনো অক্ষত রয়েছে। ফলে প্রয়োজন হলে তারা এই জলপথে কয়েক শতাধিক মাইন স্থাপন করার সক্ষমতা রাখে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এখন প্রচলিত নৌবাহিনীর পাশাপাশি কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। ছোট মাইন স্থাপনকারী নৌকা, বিস্ফোরকবোঝাই বোট এবং উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারির মাধ্যমে তারা এই প্রণালিতে একটি শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে মাইন স্থাপন করে থাকে, যদিও আমাদের কাছে এখনো নিশ্চিত তথ্য নেই, আমরা চাই সেগুলো অবিলম্বে সরিয়ে ফেলা হোক।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, মাইন স্থাপন করা হয়ে থাকলে এবং তা অপসারণ না করা হলে ইরানকে এমন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। তবে ইরান যদি দ্রুত এসব সরিয়ে নেয়, তাহলে সেটিকে তিনি ‘সঠিক পথে একটি বড় পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখবেন বলেও উল্লেখ করেন।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, ট্রাম্পের নির্দেশনায় ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) হরমুজ প্রণালিতে ইরানের মাইন স্থাপনকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এসব জাহাজ ধ্বংস করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড এক পোস্টে জানায়, হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি ইরানের ১৬টি মাইন স্থাপনকারী জাহাজসহ বেশ কয়েকটি নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে।
এর আগে আইআরজিসি সতর্ক করেছিল, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হতে পারে। চলমান উত্তেজনার কারণে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতির ঝুঁকি বিবেচনায় একে সিএনএনের কাছে ‘ডেথ ভ্যালি’ বা ‘মৃত্যু উপত্যকা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত মার্কিন নৌবাহিনী কোনো বাণিজ্যিক জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরাসরি নিরাপত্তা দিয়ে পার করে দেয়নি। তবে বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখা হবে। সেখানে আমাদের অনেক নৌজাহাজ রয়েছে এবং মাইন শনাক্ত করার জন্য বিশ্বের সেরা প্রযুক্তি আমাদের হাতে আছে।”
বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং আরও প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল পরিশোধিত জ্বালানি এখন কার্যত পারস্য উপসাগরেই আটকা পড়ে আছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরাক ও কুয়েতের মতো বড় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালি ছাড়া তেল রপ্তানির বিকল্প পথ খুবই সীমিত। এ পরিস্থিতিতে তেলের ঘাটতি মোকাবিলায় বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে বড় অর্থনীতির দেশগুলোর জোট জি-৭।
