মধ্যপ্রাচ্যে ইরান–ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রণালী পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ হলে তা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য ‘অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা’ তৈরি করতে পারে।
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ প্রতিদিন গড়ে ২০–২১ মিলিয়ন ব্যারেল এই প্রণালী দিয়ে যায়। একই সঙ্গে বৈশ্বিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশও এই পথেই পরিবাহিত হয়, যার বড় অংশ আসে কাতার থেকে। ফলে এই রুটে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, প্রণালী বন্ধ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। ইতোমধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখাতে শুরু করেছে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে এশিয়ার অর্থনীতি। হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া জ্বালানির প্রায় ৮৪ শতাংশই যায় এশিয়ার দেশগুলোতে। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ভারতের প্রায় অর্ধেক তেল ও ৬০ শতাংশ গ্যাস এই পথ দিয়েই আমদানি হয়। সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন ঘটলে এসব দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ খাত ও শিল্প কার্যক্রম বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে।
শুধু জ্বালানি নয়, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও হরমুজ প্রণালী একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর। প্রণালী বন্ধ হলে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হবে। এতে পরিবহন সময় ও খরচ বাড়বে। পাশাপাশি যুদ্ধঝুঁকিজনিত বীমা (ওয়ার রিস্ক ইন্স্যুরেন্স) প্রিমিয়ামও কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে, যা আমদানি–রপ্তানি ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের এই ঊর্ধ্বগতি বিশ্বজুড়ে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি করতে পারে এবং অনেক দেশ অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। উন্নয়নশীল ও জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যদিও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু বিকল্প পাইপলাইন অবকাঠামো রয়েছে, তবে সেগুলোর সক্ষমতা হরমুজ প্রণালীর মোট পরিবহন ক্ষমতার মাত্র ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বহন করতে পারে। ফলে প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ হলে তার কার্যকর বিকল্প বর্তমানে সীমিত।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সরবরাহ শৃঙ্খল ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে এমন আশঙ্কাই জোরালো হচ্ছে আন্তর্জাতিক মহলে।
