৯১ বছরের গুলজার: বহুমাত্রিক সৃজনের আলোকিত জীবন

সম্পাদকীয় :

6 Min Read
গুলজার, ছবি - সংগৃহীত।

গুলজার কেবল একজন কবি বা গীতিকার নন; তিনি এক ইতিহাসস্মৃতি বহনকারী শিল্পী। দেশভাগের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে প্রেম, প্রতিবাদ ও মানবিকতার ভাষা—সবকিছুই তাঁর সৃষ্টির ভেতর বহুমাত্রিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ৯১ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও তাঁর কবিতা, গান ও গল্প সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ সেগুলো আমাদের বর্তমান সমাজের অস্থিরতা, বিভাজন ও আশার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। প্রশ্ন শুধু তাঁর দীর্ঘায়ু নয়, বরং তাঁর শিল্প কীভাবে সময়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে আজও মানবিকতার আলো জ্বালায়।

আগাস্টের ১৮ তারিখে ভারতীয় উপমহাদেশের এক অনন্য শিল্পীর বয়স পূর্ণ হলো ৯১ বছর। তিনি গুলজার—কবি, গীতিকার, গল্পকার ও চলচ্চিত্রকার। জন্মেছিলেন পাঞ্জাবের দিনা শহরে, দেশভাগের অস্থির সময়কালে। তাঁর শিল্পযাত্রার শুরু হয়েছিল ছোট শহরের অচেনা অলিগলি থেকে, কিন্তু সেই যাত্রা শেষ হয়নি আজও। বরং বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সৃজনশীলতা আরও প্রসারিত হয়েছে, গভীর হয়েছে, বহুমাত্রিক হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, গুলজার কেন আজও প্রাসঙ্গিক? কেন তাঁর লেখা, তাঁর গান, তাঁর কাব্যরূপ আজও পাঠক-শ্রোতাদের হৃদয় নাড়া দেয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় তাঁর সৃজনভুবনের ভেতরকার দর্শনে। শিল্পের ভেতরে ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি গুলজারের কবিতা ও ছোটগল্পের অন্যতম বড় শক্তি হলো ইতিহাসকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। তাঁর ছোটগল্প রাভি পার বা খৌফ–এ দেশভাগের ভয়াবহতা জীবন্ত হয়ে ওঠে।

মাটিতে রক্তের দাগ, উচ্ছেদ হওয়া মানুষ, অচেনা সীমান্তের ভীতি সবকিছু যেন চরিত্র হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে তাঁর কবিতা Refugee বা ১৮৫৭–তে দেখা যায় ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া, যা শুধুমাত্র অতীতের ঘটনা নয়, বর্তমানের সমাজবীক্ষারও আয়না। গুলজার এখানে কোনো ইতিহাসবিদের মতো ঘটনা বর্ণনা করেননি। বরং তাঁর দৃষ্টিতে ইতিহাস হলো মানুষের বেদনার বহিঃপ্রকাশ, সাধারণ মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম। তাই তাঁর লেখায় ইতিহাস কেবল তথ্য নয়, বরং জীবনের রূপক হয়ে ওঠে। প্রেম ও প্রতিবাদের দ্বৈত সুর গুলজারের কাব্যে প্রেম বারবার ফিরে আসে। তবে সেটি নিছক আবেগের মোহ নয়; প্রেম তাঁর কাছে প্রতিরোধের এক অনন্য ভাষা।

যখন তিনি লেখেন “চাঁদ নিরর্থক হাসছে, কোনো ষড়যন্ত্র লুকোচ্ছে” তখন সেটি শুধু প্রকৃতির রূপকল্প নয়, বরং সমাজ-রাজনীতির অস্থিরতার প্রতীক। আবার “চাঁদের ঠোঁটের ছোঁয়া চোখে নিয়ে বেঁচে থাকা”—এই পঙ্‌ক্তি যেমন প্রেমের গান, তেমনি বেঁচে থাকার অন্বেষণও বটে। প্রেম তাঁর কাছে জীবনের রূপক, আবার প্রতিবাদেরও প্রতীক। সামাজিক অবিচার, পিতৃতান্ত্রিক শৃঙ্খল কিংবা রাজনৈতিক দমননীতির বিরুদ্ধে তাঁর লেখায় প্রেম দাঁড়িয়েছে নীরব কিন্তু দৃঢ় এক অস্ত্র হিসেবে। সংলাপের শক্তি গুলজারের শিল্পকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সংলাপের ব্যবহার।

চলচ্চিত্রে যেভাবে সংলাপ চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলে, তাঁর কবিতা ও গল্পেও তেমনি সংলাপ এক নাটকীয় আবহ তৈরি করে। ফলে পাঠক শুধু পড়েন না, বরং চরিত্রদের সঙ্গে কথোপকথনে যুক্ত হয়ে যান। এই সংলাপভিত্তিক ভঙ্গি তাঁর লেখাকে আরও গ্রহণযোগ্য ও প্রভাবশালী করেছে। কারণ সমাজের বাস্তবতা, মানুষের যন্ত্রণা বা ভালোবাসার গভীরতা সবকিছুই তিনি মানুষের ভাষায় বলেছেন।

কোনো দুর্বোধ্য প্রতীক বা জটিল রূপকের আড়ালে লুকিয়ে থাকেননি। দেশভাগ ও ভাঙাচোরা স্মৃতির পুনর্নির্মাণ দেশভাগের ক্ষতচিহ্ন গুলজারের সৃজনভুবনে বারবার ফিরে আসে। তাঁর গল্প খৌফ–এ দেখা যায়, এক মানুষ মৃত্যুভয়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, যা দেশভাগ-পরবর্তী বিভীষিকার প্রতীক। আবার সাঁস লেতা সোনা–তে শ্রমিকজীবনের দুর্দশা নতুনভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এসব গল্প কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; বরং উপমহাদেশের বিভাজিত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। গুলজারের শিল্পকর্মে দিনা শহরের স্মৃতি এক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে।

শৈশবের সেই শহর, দেশভাগের পর ত্যাগ করতে হওয়া গৃহ, আর সীমান্তের দাগ সব মিলিয়ে তাঁর শিল্পযাত্রার মূলে রয়েছে ভাঙাচোরা স্মৃতি পুনর্নির্মাণের প্রচেষ্টা। সামাজিক বৈষম্য ও সাধারণ মানুষের যন্ত্রণা গুলজারের সৃষ্টিশীলতা কেবল রোমান্টিক আবেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি খুব সচেতনভাবে সাধারণ মানুষের কষ্ট, দুঃখ ও অবদমিত জীবনের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর চরিত্ররা অনেক সময়ই নিছক কোনো আন্দোলনের অংশ নয়; বরং ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ‘আধা’ নামের এক চরিত্রের কথা বলা যায়। কোনো বৃহৎ আন্দোলনের প্রতিনিধি না হয়েও তিনি সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া হিসেবে দাঁড়িয়েছেন প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে।

গুলজারের সৃষ্টিশীলতা এখানেই গুরুত্বপূর্ণ, তিনি প্রমাণ করেছেন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও হতে পারে সামাজিক প্রতিবাদের শক্তিশালী ভাষা। গুলজারের কবিতার চিত্রকল্প গুলজারের কবিতা পড়তে গেলে বোঝা যায়, তাঁর চিত্রকল্পগুলো অত্যন্ত জীবন্ত ও প্রতীকধর্মী। চাঁদ, রাত, আলো-অন্ধকার, নদী, মেঘ—সবকিছু তাঁর কবিতায় কথা বলে। কিন্তু এগুলো নিছক প্রকৃতির বর্ণনা নয়; এগুলো জীবনের রূপক, মানবিক বেদনার প্রতিচ্ছবি।

- Advertisement -

সমকালীনতার ধারাবাহিকতা গুলজারের শিল্পচর্চা কেবল অতীতের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি সমকালীন সমাজ-বাস্তবতাকেও তাঁর লেখায় জায়গা দিয়েছেন। বোম্বাই শহরের সামাজিক অস্থিরতা, সাধারণ মানুষের যাপন, এমনকি সিনেমার জগৎ—সবই তাঁর সৃজনশীলতার অংশ। এখানে তাঁকে আমরা মুনশি প্রেমচাঁদ বা সাদত হাসান মান্টোর উত্তরসূরি হিসেবেও দেখতে পারি। মান্টো যেমন টোবা টেক সিং–এ দেশভাগের যন্ত্রণা ফুটিয়ে তুলেছিলেন, গুলজারও একইভাবে তাঁর গল্পে এবং কবিতায় সেই যন্ত্রণা নতুন মাত্রায় রূপ দিয়েছেন।

কেন প্রাসঙ্গিক গুলজার? প্রশ্ন উঠতে পারে ৯১ বছরের এক শিল্পীর সৃষ্টিশীলতা আজকের প্রজন্মের কাছে কতটা প্রাসঙ্গিক? উত্তর হলো, খুবই প্রাসঙ্গিক। কারণ আজও আমরা বিভাজন, বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা ও সহিংসতার মধ্যে বাস করছি। আজও সাধারণ মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে হয়, আজও প্রেমকে প্রতিবাদের ভাষা বানাতে হয়। গুলজারের সৃজন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিল্প কেবল বিনোদন নয়; শিল্প হলো সমাজকে বদলে দেওয়ার হাতিয়ার, ইতিহাসকে স্মরণ করার মাধ্যম এবং মানবিকতার সর্বশেষ আশ্রয়।

তাঁর কবিতা ও গান আজও সেই মানবিক বোধকে জাগ্রত করে, যা আমাদের ভেতরের অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়। উপসংহার গুলজারের সৃজনযাত্রা তাই কেবল এক ব্যক্তির জীবনকাহিনি নয়; বরং পুরো উপমহাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতিফলন। তাঁর লেখা পড়লে আমরা শুধু প্রেমে ভাসি না, বরং সমাজের বৈষম্য ও অবিচারকে নতুন করে চিনতে শিখি।

- Advertisement -

তাঁর কাব্যিক চিত্রকল্পে যেমন চাঁদের আলো ঝরে, তেমনি প্রতিবাদের অগ্নিশিখাও জ্বলে ওঠে। আজ তাঁর বয়স ৯১ । কিন্তু তাঁর সৃজন আজও তরতাজা, আজও সমকালীন। গুলজার আমাদের শেখান—ভালোবাসা হতে পারে প্রতিরোধের ভাষা, স্মৃতি হতে পারে আশার উৎস, আর শিল্প হতে পারে মানবিকতার আলোকবর্তিকা।

রেজা নাঈমের লেখার বাংলা রূপান্তর করেছেন মনিরুল ইসলাম।

 

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *