কবি তন্ময় মাহমুদ তাঁর বাবা শামসুদ্দোহা মাহমুদের পথ অনুসরণ করছেন। বাবা ছিলেন সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার। শৈশব কেটেছে শিল্প ও সাহিত্যের পরিবেশে, যা তার লেখার প্রতি আগ্রহ ও সৃষ্টিশীলতাকে প্রভাবিত করেছে। পেশায় সাংবাদিক তন্ময় মাহমুদ দেশের বিভিন্ন খ্যাতনামা গণমাধ্যমে কাজ করেছেন এবং বর্তমানে চ্যানেল আইতে কর্মরত। তিনি ১৯৮৬ সালে ঢাকার রামপুরায় জন্মগ্রহণ করেন এবং বড় হন শাহজাহানপুরে। পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন মতিঝিল মডেল স্কুল এবং হাবিবুল্লাহ বাহার বিশ্ববিদ্যালয়ে।
তরুণ কবি তন্ময় মাহমুদের পাঁচটি কবিতা;
এ শহরে রোজ ঈশ্বর নেমে আসে…
উদ্ভ্রান্ত সময়ের মত রাত-
পাক খেয়ে উড়ে যায়, অস্ফুট হৃদপিণ্ডের দেয়াল চিরে
সাপের হিস্ হিসে সাইরেনে কেঁপে ওঠে ঝকঝকে সার্কাস
অর্কেষ্ট্রার উন্মাদ দ্রবণে উদ্যত হতে থাকে
ক্লাউনের উন্মত্ত হাসি …
বিক্ষুব্ধ মদের তালে তালে গাড়ল বাক্স চড়ায় অশ্লীল ফোয়ারা
ভাগাড়ের শকুন কালো কোটের কুতকুতে চোখে-
চেখে দেখে ন্যংটো রাজার ইম্পোর্টেড আফিম
শুয়োরেরা হামাগুড়ি খায়, সবান্ধব খোয়াড়ে…
শহরের ফোয়ারা সুচতুর বিকিয়ে বেড়ায়
বিশ্বাসের এক্সট্রা লার্জ বিকিনি,
লালবাতি গুলো নিভে যায়!
এই নগরের আনাচে-কানাচে রোজ ঈশ্বর নেমে আসে
সে ঈশ্বর বড় একপেশে, সে ঈশ্বর শুধু অন্ধকারেই হাসে …
রক্তাক্ত শহরে
অদ্ভুত উদ্ভ্রান্ত শহরের বুকে হেঁটে চলেছি আমি
মোড়ে মোড়ে সদ্য মৃতের রক্তাক্ত করোটির সাথে চলছে দুর্ধর্ষ ড্রিবলিং
ভূলুন্ঠিত মানবতার সাথে প্রকাশ্য ধর্ষন থামাতে এসে আরো একপ্রস্থ ধর্ষন করে যায় শান্তিরক্ষীর দল
বিকেলের সোনা রোদের গায়ে চাপে জলপাই গন্ধ
গেরিলার ষ্টেনগানে মড়চে পড়ে গেছে সেই কবেই
দুর্ধর্ষ কলমযোদ্ধার হাতে এখন শোভা পায় আপোষের উষ্ণ উন্নত স্তন
সুদৃশ্য অট্টালিকার খোপে চলে শান্তি শান্তি খেলা
রক্তাক্ত শিশুর ছিন্ন দেহ খুবলে খায় ক্ষমতার রাজনীতি
মেরুদন্ড খসে পড়া মানুষগুলো পাশ কেটে চলে যায় নিশ্চিত বেহেস্তের চৌরাস্তায়
নর মাংসের পোড়া হাড়গোরে জ্বলে মাধ্যরাত্রির বারবিকিউ পাটিঁ
এ কোন শহর আমি দেখছি
এ কোন দুঃস্বপ্নে হেঁটে চলেছি আমরা …
বিমূর্ত প্রহর
কতশত সহস্র বছর আটকে থাকি, সিগনালের মোড়ে…
সড়ক দিব্যি হেঁটে যায়, অথচ সময় বড় স্থির
স্বাপ্নিকতায়…
খেয়ালের দেয়ালে দেয়ালে…
নিঃশব্দ বোধ, নির্বোধ প্রতিক্ষায় মুহূর্তে এঁটে যায়
স্থির ছবির স্তব্ধ অ্যালবামে। বুকের কনডোমিনিয়ামে বৃষ্টি নামে, স্লো-মোশন
ছাঁদ পেতে হাত জমিয়ে রাখি শূন্যতায়
জমে জমুক, জল।
চিন্তার নিগুঢ় করতলে শব্দেরা খেলে যায়…
আবছা থেকে আবছায়ায়, দূর থেকে বহু দূরে-
জল পরে… পাতা নড়ে…
জল পরে… পাতা নড়ে…
ফসিল
তিতাস নদীরও একদিন একটা গল্প ছিলো
বৃষ্টির রাতে নদীর মধ্যপথে পালতোলা জেলে নৌকার হল্লা ছিলো
জলের ওপর জীবন ছিলো
জলের ভেতর জীবন ছিলো
দু-পাড়েও ছিলো জীবনের শব্দ;
শুকনো কবিতা খুঁড়ে দেখো
খসখসে চরের বুকে এখনও পাবে সাহসী মাঝির কাঠকঙ্কাল নৌকো,
পাবে আটপৌরে জীবনের সংগ্রাম মাখা হাসি
পাবে যুবতী নদীর সোঁদা ঘ্রাণ
পাবে কিশোরীর টিপপটিপে বুকে লুকিয়ে রাখা নতুন প্রেমের গল্প
পাবে ধড়ীবাজ মোড়লে ছোঁকছোঁকে কালচে অন্তর
পাবে মাঝ রাতে, রূপলী মাছ শিকারীর
বীর বেশে ঘরে ফেরা চোখ
পাবে দুঃখ-বেদনায় মাখা জীবনের শৈল্পিক ছন্দ …
ফারাক শুধু এতটুকুই
আজও তারা বাঁচে, জলের স্পর্শহীন বালির অতলে …
জীবন কখনও মরে যায় না,
চাপা থেকেও বেঁচে থাকে অনন্ত বছর…
শুধু নদী বেঁচে থাকে না,
নদী … মরে যায়!!
প্যাঁচ কেটে গেলে
প্যাঁচ কেটে গেলে, সূর্যটা খুব কাছে
প্যাঁচ কেটে গেলে, ঢিলে হয়ে যায় পেশি
প্যাঁচ কেটে গেলে, গঙ্গাতে ভাসে কীড়ে
প্যাঁচ কেটে গেলে ‘তারপরও ভালোবাসি’
প্যাঁচ কেটে গেলে, ভ্রান্তিতে ওড়ে ঘুড়ি
প্যাঁচ কেটে গেল, হাহাকার করে চিল
প্যাঁচ কেটে গেলে, হঠাৎ একলা হওয়া
একা চেয়ে দেখা, কাকচক্ষুর বিল…
প্যাঁচ কাটা মানে, মাতাল ফাগুন হাওয়া
প্যাঁচ কেটে গেলে, বিষণ্ণ রাজপথ
প্যাঁচ কেটে গেলে, কৃষ্ণচুড়াও কালো
প্যাঁচ কেটে গেলে, চিঠির মেলেনা খোঁজ…
প্যাঁচ কেটে গেলে, তুমি আমি কতদূর
প্যাঁচ কেটে গেলে, আদর গুলোও মিছে
প্যাঁচ কেটে গেলে, তবুও ভেতরে ‘তুমি’
সব ভুলে চাই ছুটে আসো হর-রোজ…
