মালালা পাকিস্তানে কেন এত সমালোচিত? সোয়াতের এক সাধারণ মেয়ে, যাকে ১৫ বছর বয়সে তালেবানরা মেয়েদের শিক্ষার পক্ষে কথা বলার জন্য গুলি করে হত্যা করতে চেয়েছিল, পরবর্তীতে তিনি সাহসের বিশ্বব্যাপী মুখ হয়ে ওঠেন, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হন এবং আজও শিক্ষার বিস্তারে গ্লোবাল পোস্টার গার্ল। মালালার নতুন স্মৃতিকথা প্রকাশের সাথে সাথে, তার গল্প আবার আলোচনায় এসেছে। তবুও পাকিস্তানে তাকে ‘পুতুল’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, ‘অত্যধিক পশ্চিমা’ বলে সমালোচিত করা হয়, এবং ‘যথেষ্ট কাজ না করার’ জন্য নিন্দা করা হয়।
মালালার তিরস্কার অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়নযোগ্য প্যারাডক্স , যা আমাদেরকে আমাদের নিজেদের স্বভাব এবং চিন্তাভাবনা সম্পর্কে সচেতন করে।
অর্থনীতিবিদ জর্জ আকেরলফ এবং র্যাচেল ক্র্যান্টন, তাদের ‘পরিচয়ের অর্থনীতি’ তত্ত্বে যুক্তি দেন যে লোকেরা সামাজিক গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত হয়ে সন্তুষ্টি পায়: জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ এবং যখন তাদের গোষ্ঠীর কেউ তার নিয়ম লঙ্ঘন করে বলে মনে হয় তখন ক্ষতি অনুভব করে। পাকিস্তানে, জাতীয় পরিচয় প্রায়শই পশ্চিমাদের বিপরীতে সংজ্ঞায়িত করা হয়। সোয়াতের একজন মেয়ে যখন পশ্চিমা মিডিয়ায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তখন তার সাফল্যকে ভুলভাবে গোত্রত্যাগ হিসেবে দেখা হয়, এটি একটি সংকেত যে সে এখন অন্য গোষ্ঠীর ‘অন্তর্ভুক্ত’।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো ছিল সমাজের নিজের পরিচয় ভারসাম্য রক্ষার উপায়, যা তাকে ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করে।
এখানে ন্যায্যতা এবং আপেক্ষিক তুলনার একটি তত্ত্বও কাজ করছে। মানুষ সাফল্যকে পরমভাবে নয় বরং তুলনার মাধ্যমে বিচার করে। অর্থনীতিবিদ আর্নস্ট ফেহর এবং ক্লাউস শ্মিট একে ‘অবৈষম্য বিদ্বেষ’ বলে অভিহিত করেছেন: আমরা এমন ফলাফল সহ্য করতে পারি না যা আমাদের কাছে ‘অপ্রাপ্য’ মনে হয়, যদিও তা আমাদের সরাসরি ক্ষতিও করেনা। অনেক পাকিস্তানি মালালার আকস্মিক বিশ্বব্যাপী খ্যাতিকে তার বয়স এবং কর্মের তুলনায় অসঙ্গত বলে মনে করেন। লক্ষ লক্ষ মেয়ে যখন স্কুলে ভর্তির জন্য লড়াই করছে, তখন ভোট দেওয়ার বা স্নাতক হওয়ার আগেই তিনি নোবেল বিজয়ী হয়েছেন। তাকে নিয়ে গর্ব করার পরিবর্তে, লোকেরা বঞ্চিত বোধ করছে, যেন বিশ্ব একটি মেয়েকে পুরস্কৃত করেছে এবং বাকিদের উপেক্ষা করেছে।
যদিও তার প্রতি সন্দেহ বা অবমূল্যায়নের এই প্রবৃত্তি মালালার চেয়ে আমাদের সম্পর্কে বেশি কিছু বলে। অর্থনৈতিক তত্ত্ব আমাদের অস্বস্তি ব্যাখ্যা করে তবে এটিও দেখায় যে কেন আখ্যান পরিবর্তন করা আরও ভাল ফলাফল আনতে পারে। পরিচয় ও ন্যায্যতা আচরণ গড়ে তোলে; তাই ধারণা বদলালেই প্রণোদনাও বদলানো যায়।। মালালার সাফল্যকে অপরিচিত না দেখে পাকিস্তান এটিকে ‘সমষ্টিগত মূলধন’ হিসেবে দেখুক, সাধারণ মেয়েদের শিক্ষার সুযোগে সম্ভবপরতার প্রমাণ।
অর্থনীতিবিদরা এটিকে ‘রোল-মডেল প্রভাব’ বলে অভিহিত করেন: যখন মেয়েরা তাদের মতো লোকদের সফল হতে দেখে, তখন তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তারা নিজেও পারবে, এবং এই বিশ্বাস তাদের লক্ষ্য ও পরিশ্রমের মাত্রা পরিবর্তন করে। বেল এট আল. (২০১৯) দেখেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সেই অঞ্চলে বড় হওয়া মেয়েরা, যেখানে বেশি মহিলা উদ্ভাবক আছেন, তারা নিজেও উদ্ভাবক হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রক্রিয়াটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী: দৃশ্যমানতা ‘আকাঙ্ক্ষার জানালা’ প্রসারিত করে। মালালার গল্প পাকিস্তানের মেয়েদের জন্যও একই কাজ করতে পারে।
তার হালকা মেজাজের ইনস্টাগ্রাম রিলগুলো দেখায় কিভাবে সে একজন আত্মবিশ্বাসী তরুণীতে পরিণত হয়েছে: মালালা ফান্ড প্রতিষ্ঠা করা, অক্সফোর্ড থেকে ডিগ্রি সম্পন্ন করা এবং স্কুলে যাওয়া থেকে বঞ্চিত শিশুদের পক্ষে কথা বলা অব্যাহত রাখা। মালালা এমন অনেক কিছু করেছেন যা অধিকাংশ পাকিস্তানি স্বীকার করতে চান না। যখন আক্রমণটি ঘটে, তখন সে কেবল একটি শিশু ছিল, এখনও নিজের পরিচয় খুঁজছে। কিন্তু তার পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে, আমরা আমাদের সন্দেহকে বিচারে পরিণত করেছি।
পাকিস্তান তার মেয়েদের নিয়ে সন্দেহ করে থাকতে পারে না। তাদের আরও ভালো কিছু প্রাপ্য, এমন মেয়ে যারা প্রশ্ন করতে, শিখতে এবং নেতৃত্ব দিতে স্বাধীন বোধ করে। আমরা যখনই কোনও মেয়েকে চুপ থাকতে বলি অথবা পিছনের দিকে ঝুঁকে পড়তে বলি, তখনই আমরা আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ সঙ্কুচিত করে ফেলি। যখন নারীরা বড় হয়, তখন জাতিও বড় হয়। মালালাকে উদযাপন করা মানে কেবল একজন ব্যক্তির প্রতিমা তৈরি করা নয়; এটি আমাদের মেয়েদের কী সম্ভব তা দেখানো। চলুন তাদের শিখাই যে শক্তি, কৌতূহল এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা এমন ত্রুটি নয় যা লুকানোর, বরং এমন মূল্যবোধ যা লালন করার তাদের জন্য, এবং পাকিস্তানের জন্য। কারণ শেষ পর্যন্ত আসল প্রশ্ন হল পাকিস্তানি কেন মালালার প্রতি ক্ষুব্ধ হয় তা নয়, বরং পাকিস্তান কেন তার প্রতিনিধিত্ব করার শক্তিকে ভয় পায়।
মূল লেখক: কুলসুম হিসমা, স্ট ওলাভ কলেজ, অর্থনীতি বিভাগ, সহকারী অধ্যাপক।
