রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সরকার পরিবর্তনের ঘটনাকে ঘিরে দেশে আবারও আলোচনায় এসেছে ‘ডিপ স্টেট’ (গুপ্তরাষ্ট্র বা অন্তঃরাষ্ট্র) ধারণা। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠছে, সরকার পতনের পেছনে শুধু দৃশ্যমান রাজনৈতিক কারণ নয়, বরং অদৃশ্য প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ভূমিকাও থাকতে পারে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বিষয়টি জটিল এবং একপাক্ষিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
রাজনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় ‘ডিপ স্টেট’ বলতে এমন এক অদৃশ্য শক্তিকে বোঝানো হয়, যারা সরাসরি ক্ষমতায় না থেকেও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বা ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এ ধারণার সঙ্গে সাধারণত নিরাপত্তা সংস্থা, প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, প্রভাবশালী অর্থনৈতিক গোষ্ঠী কিংবা আন্তর্জাতিক শক্তির নাম জড়ানো হয়। যদিও এই ধারণার বাস্তব অস্তিত্ব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও সাম্প্রতিক সময়ে এ ধারণা নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেছেন, ডিপ স্টেট তাদের দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার প্রস্তাব দিয়েছিল।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকার পতনের কারণ নিয়ে তিন ধরনের ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। প্রথমত সরকারের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা যেমন নীতিগত ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সংকট বা জনঅসন্তোষ। দ্বিতীয়ত, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির আন্দোলন ও চাপ। তৃতীয়ত, কথিত ‘ডিপ স্টেট’ তত্ত্ব, যেখানে অদৃশ্য কোনো শক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়।
বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের মতে দেশে এ ধরনের পরিস্থিতিতে কিছু সাধারণ অভিযোগ প্রায়ই উঠে আসে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন, নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা, আন্তর্জাতিক প্রভাবের সম্ভাবনা এবং বড় অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তার।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, সব রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ডিপ স্টেট দিয়ে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক চাপ, জনঅসন্তোষ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও গণআন্দোলনই প্রধান ভূমিকা রাখে। ফলে ডিপ স্টেটের ধারণা কখনো বাস্তবতার অংশ হতে পারে, আবার অনেক সময় এটি রাজনৈতিক বক্তব্য বা দোষারোপ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
কয়েকটি ঐতিহাসিক উদাহরণে ডিপ স্টেট সদৃশ প্রভাবের অভিযোগ ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।
১৯৭৩ সালে চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট সালভাদর আয়েন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। জেনারেল অগাস্টো পিনোশের নেতৃত্বে সংঘটিত এই অভ্যুত্থানে দেশের সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামোর ভূমিকার পাশাপাশি বিদেশি প্রভাব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।
তুরস্কে ১৯৮০ সালের সামরিক অভ্যুত্থানও ডিপ স্টেট ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলে। সেখানে সেনাবাহিনী নিজেদের রাষ্ট্রের রক্ষক হিসেবে দাবি করে নির্বাচিত সরকারকে অপসারণ করে। পরবর্তীতে দেশটিতে সামরিক-আমলাতান্ত্রিক প্রভাব নিয়ে বিস্তর বিতর্ক তৈরি হয়।
২০১৩ সালে মিশরে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয় সেনাবাহিনী। তৎকালীন সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির নেতৃত্বে এই পরিবর্তনের পর বিশ্লেষকরা বলেন, দেশটির দীর্ঘদিনের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোই মূল ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে।
এর আগে ১৯৫৩ সালে ইরানে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনাও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচিত। এতে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত শক্তির সমন্বিত প্রভাব হিসেবে বিবেচিত হয়।
পাকিস্তানেও ১৯৭৭ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। জিয়াউল হকের নেতৃত্বে সংঘটিত এই অভ্যুত্থানে সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তির প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
২০২২ সালে পাকিস্তানে ইমরান খানের পতনের পর ডিপ স্টেট বা অদৃশ্য ক্ষমতাকাঠামোর ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। তবে বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে হলে রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামরিক প্রভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাকিস্তানের পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খান ক্ষমতা হারান। এটি ছিল দেশটির ইতিহাসে প্রথম সফল অনাস্থা ভোট, যার মাধ্যমে একজন প্রধানমন্ত্রীকে সরানো হয়।
তুরস্কে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ২০১৬ সালের ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের জন্য ফেতুল্লাহ গুলেনের অনুসারীদের একটি ‘ডিপ স্টেট’ নেটওয়ার্ককে দায়ী করেন।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার পতনে ডিপ স্টেটের ভূমিকা ছিল বলে দাবি করেছে আওয়ামী লীগ।
নেপালে সাম্প্রতিক ২০২৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কেপি শর্মা অলির সরকারের পতনের পেছনেও অনেক বিশ্লেষক বিদেশি ডিপ স্টেটের ইন্ধন দেখছেন।
‘ডিপ স্টেটের কারণে সরকার পতন’ এই ধারণাটি রাজনীতি ও ইতিহাসে বহুল আলোচিত হলেও, বাস্তবে খুব কম ক্ষেত্রেই সরাসরি প্রমাণিতভাবে বলা যায় যে শুধুমাত্র ডিপ স্টেট এককভাবে কোনো সরকার পতন ঘটিয়েছে। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, আমলাতন্ত্র বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সমন্বিত ভূমিকা—যাকে অনেকেই ডিপ স্টেট বলে অভিহিত করেন।
