বিদ্যুৎ খাতে রেকর্ড লোকসান: এক বছরে পিডিবির ঘাটতি ৫৫ হাজার কোটি টাকা

বুধবার পিডিবির বোর্ড সভায় গত অর্থবছরের আয় ব্যয়ের হিসাব অনুমোদন করা হলেও তা প্রকাশে সংস্থার অর্থ সদস্য অঞ্জনা খান মজলিস আপাতত অনীহা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, আনুষ্ঠানিক সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে হিসাব প্রকাশ করা হবে।

বিশেষ প্রতিনিধি :

3 Min Read

গত অর্থবছরে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও খুচরা মূল্য সমন্বয় না হওয়ায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ৫৫ হাজার কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এই ঘাটতির মধ্যে ৩৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে দিলেও অবশিষ্ট ১৭ হাজার কোটি টাকার বোঝা বহন করতে হচ্ছে পিডিবিকেই। আগের অর্থবছরেও বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার লোকসান হয়েছিল। বুধবার পিডিবির বোর্ড সভায় গত অর্থবছরের আয় ব্যয়ের হিসাব অনুমোদন করা হলেও তা প্রকাশে সংস্থার অর্থ সদস্য অঞ্জনা খান মজলিস আপাতত অনীহা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, আনুষ্ঠানিক সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে হিসাব প্রকাশ করা হবে।

পিডিবির ব্যাখ্যায় বলা হয়, গত বছর বিদ্যুতের দাম অপরিবর্তিত ছিল কিন্তু গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বেশি দামে ফার্নেস অয়েল ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হয়েছে। এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১০ টাকা ৮০ পয়সা এবং বিতরণ কোম্পানির কাছে সরবরাহ ব্যয় পৌঁছে যায় ১২ টাকা ৫০ পয়সায়। বিপরীতে বিক্রিমূল্য নির্ধারিত ছিল মাত্র ৬ টাকা ৯৯ পয়সা। এই বিশাল ফারাক থেকেই ৫৫ হাজার কোটি টাকার লোকসান তৈরি হয়েছে।

এদিকে সরকারি–বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিশেষ করে আইপিপি ও রেন্টাল প্ল্যান্টগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সব চুক্তি পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় কমিটি সম্প্রতি জানিয়েছে, গত ১৫ বছরে এ খাত থেকে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। সরকারি নীতি অনুযায়ী বেসরকারি কেন্দ্রের উৎপাদিত বেশি দামের বিদ্যুতের ক্ষতিপূরণ ভর্তুকি হিসেবে দেয় সরকার, কিন্তু সরকারি কেন্দ্রগুলো একই সুবিধা পায় না।

পিডিবির হিসাব অনুযায়ী গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিট ৭ টাকা, কয়লাভিত্তিকে ১৩ টাকা, ফার্নেস অয়েলে ২২ টাকা, ভারত থেকে আমদানিতে ৮ টাকা এবং ডিজেলভিত্তিক উৎপাদনে ৪০ টাকার বেশি খরচ হয়। দেশে বর্তমানে ১৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াট, যার মধ্যে ৭০টি আইপিপি কেন্দ্র। নির্ভরযোগ্যতার বিচারে এখন কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোই সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতা ৬,২০০ মেগাওয়াট।

গত অর্থবছরে মোট উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক ৪৮.৫২ শতাংশ এসেছে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে। ফার্নেস অয়েল থেকে ১১.৮৩ শতাংশ, ডিজেল থেকে ০.৪৬ শতাংশ, সৌর থেকে ৯ শতাংশ, জলবিদ্যুৎ থেকে ০.৮৬ শতাংশ এবং বায়ু থেকে ০.০৭ শতাংশ উৎপাদিত হয়েছে। বাকি অংশ এসেছে ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাত এখনো অরাজকতার মধ্যে রয়েছে এবং সরকার খাতটিকে শৃঙ্খলায় ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে। জাতীয় কমিটির সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আইপিপির মালিক, আমলা ও রাজনীতিবিদদের যোগসাজশে ব্যাপক অনিয়মের কারণে গ্রাহকদের বিদ্যুতের জন্য ২৫ শতাংশ বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *