আসন্ন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির আগে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক আরও কমানোর ব্যাপারে সরকার আশাবাদী বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তিনি জানান, চলমান আলোচনার মাধ্যমে পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি পণ্যে শূন্য শুল্ক নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
রোববার বিকেলে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আগে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলেও আলোচনার মাধ্যমে তা কমিয়ে ২০ শতাংশে নামানো সম্ভব হয়েছে। “এ হার আরও কমাতে আমরা কাজ করছি,” বলেন তিনি।
বোয়িংয়ের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব প্রসঙ্গে শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনার বাজার প্রায় এক লাখ কোটি টাকার। উন্নত বাজার প্রবেশাধিকার পেলে এ রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং পাল্টা শুল্কজনিত অনিশ্চয়তা দূর করতে সরকার আমদানি উদারীকরণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে, যার অংশ হিসেবে বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে ৫ থেকে ৭ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। এ প্রেক্ষাপটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স তার নেটওয়ার্ক ও বহর সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বোয়িং ও এয়ারবাস উভয় প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পর্যালোচনার পর বিমানের টেকনো-ফাইন্যান্স কমিটি প্রাথমিকভাবে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে বর্তমানে বোয়িংয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং আলোচনা সফল হলে নির্বাচনের আগেই চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ব্যাপারে তিনি বলেন, বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর এর শর্তাবলি ও অন্যান্য বিষয় জনসম্মুখে তুলে ধরা হবে। নির্বাচিত সরকারকে চাপমুক্ত রাখতেই নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার।
টিকিট সিন্ডিকেট রোধে সংস্কার, ভাড়া কমার দাবি
বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতে সংস্কার প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, টিকিট সিন্ডিকেশন ও ব্লকিং বন্ধে সরকার ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং ট্রাভেল এজেন্সি নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ সংশোধন অধ্যাদেশ জারি করেছে। এর ফলে টিকিট বিতরণ ব্যবস্থাকে লাইসেন্সিং ও জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, কঠোর নজরদারির কারণে বিমান ভাড়ায় ইতোমধ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ঢাকা–জেদ্দা রুটে গত বছর যেখানে ভাড়া ১ লাখ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছিল, বর্তমানে তা ৫৩ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।
হজ ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে উপদেষ্টা জানান, চলতি মৌসুমে হজের বিমান ভাড়া আগের বছরের তুলনায় ৫৪ হাজার টাকা কমানো হয়েছে। এবার চার্টার ফ্লাইটের পরিবর্তে নির্ধারিত সৌদিগামী ফ্লাইটে হজযাত্রী পরিবহন করা হবে। পাশাপাশি এসব ফ্লাইটে নিয়মিত যাত্রী বহনের ব্যবস্থাও থাকবে, ফলে ফিরতি আসনে টিকিটের দাম ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। এতে ঈদের আগে প্রবাসী শ্রমিকদের দেশে ফেরার সুযোগ বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সমালোচনার জবাবে সচিবের বক্তব্য
সংবাদ সম্মেলনে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসরীন জাহান বলেন, সাধারণ মানুষ ও শ্রমিকদের যৌক্তিক খরচে বিদেশ যাতায়াত নিশ্চিত করতেই আইন ও নীতিমালার সংস্কার করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু গণমাধ্যমে এভিয়েশন খাতের সংস্কার কার্যক্রম ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি জানান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মূয়ীদ চৌধুরী ব্যক্তিগত কারণে দায়িত্ব ছাড়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে আইন অনুযায়ী প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদনে শেখ বশিরউদ্দীনকে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অতীতেও এ ধরনের নজির রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইজারা ও লাইসেন্স সংক্রান্ত অভিযোগ প্রসঙ্গে সচিব বলেন, বেবিচকের স্থাবর সম্পত্তি ইজারায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। “ইজারা প্রদানের ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে—এমন দাবি সঠিক নয়,” বলেন তিনি।
হেলিকপ্টার লাইসেন্স বিষয়ে তিনি জানান, আকিজ বশির এভিয়েশন লিমিটেড নির্ধারিত নিয়মে আবেদন করেছে এবং সেটি বর্তমানে বেবিচকে পর্যালোচনাধীন। এ প্রতিষ্ঠানে শেখ বশিরউদ্দীনের শেয়ার থাকলেও তিনি ব্যবস্থাপনায় যুক্ত নন বলেও স্পষ্ট করেন সচিব।
