দীর্ঘ সময় প্রবাসে অবস্থানের পর দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন তারেক রহমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর তার রাজনৈতিক তৎপরতা সমর্থক মহলে উচ্ছ্বাস তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি দলের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখছিলেন। তবে সরাসরি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উপস্থিতি, দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক, এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ সব মিলিয়ে তার সক্রিয় ভূমিকা এখন দৃশ্যমান ও প্রতীকী দুই অর্থেই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।মা খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ৯ জানুয়ারী ২০২৬ তারিখে তারেক রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান হন।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচনী কৌশল প্রণয়ন থেকে শুরু করে প্রার্থী মনোনয়ন সব ক্ষেত্রেই তার প্রত্যক্ষ তদারকি ছিল। নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেকের কাছে তার নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সমর্থকদের ভাষায়, এটি শুধু রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নয়, বরং নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠা।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তারেক রহমানের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ একদিকে দল ও সরকারের ভেতরে ভারসাম্য রক্ষা, অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি। নির্বাচনের আগে যে প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের পথই নির্ধারণ করবে এই প্রত্যাবর্তনের স্থায়িত্ব ও প্রভাব।
তারেক রহমানের এই সক্রিয় প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি কেবল ব্যক্তির পুনরাগমন নয়, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এক নতুন রাজনৈতিক বিন্যাসের ইঙ্গিত যার ফলাফল নির্ভর করবে সময়, কৌশল এবং বাস্তবায়নের ওপর।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো তারেক রহমান-এর গ্রেফতার, কারাবাস, লন্ডন যাত্রা এবং দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফেরা। প্রায় দুই দশকজুড়ে বিস্তৃত এই অধ্যায় দেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
ফিরে দেখা তারেক রহমানের লন্ডন যাত্রা
যেভাবে গ্রেফতার
২০০৭ সালের ৭ মার্চ দিবাগত রাতে যৌথ বাহিনী ঢাকা সেনানিবাসের মঈনুল রোডের বাসা থেকে তারেক রহমানকে গ্রেফতার করে। ১/১১ পরবর্তী সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগে তাকে আটক করা হয়। গ্রেফতারের সময় তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বাসায় অবস্থান করছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে সেখান থেকেই হেফাজতে নেয়।

কারাবাস, নির্যাতনের অভিযোগ ও অসুস্থতা
গ্রেফতারের পর তিনি প্রায় ১৮ মাস কারাবন্দি ছিলেন। এ সময় বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, রিমান্ডে থাকাকালে তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়, যাতে তার মেরুদণ্ড, পাঁজর ও হাঁটুতে গুরুতর আঘাত লাগে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের প্রিজন সেলে স্থানান্তর করা হয়।
জামিনে মুক্ত ও লন্ডন যাত্রা
২০০৮ সালে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোতে পর্যায়ক্রমে জামিন পাওয়ার পর ৩ সেপ্টেম্বর তিনি বিএসএমএমইউ-এর প্রিজন সেল থেকে মুক্তি পান।এর আগে ১৩টি মামলায় জামিন পান তারেক রহমান। আদালতের অনুমতি নিয়ে উন্নত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে বিশেষ বিমানে লন্ডনের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ২৪শে এপ্রিল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথমবারের মতো স্বীকার করেন যে ২০১২ সালে তারেক রহমান ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন এবং এক বছরের মধ্যেই সেটি গৃহীত হয়েছে। (বিবিসি)

লন্ডন যাত্রার কয়েকঘণ্টা আগে তারেক রহমান দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে বেরিয়েছিল।
দীর্ঘ প্রবাস ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব
লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাসে ছিলেন। সেখান থেকেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দল পরিচালনা করেন। ভার্চ্যুয়াল সভা, নীতিনির্ধারণী নির্দেশনা এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে দূর থেকে দলীয় নেতৃত্ব দেন।
মামলা নিষ্পত্তি ও দেশে ফেরা
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোতে তিনি খালাস পান। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তিনি। বর্তমানে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখে তিনি ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ের পর বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়ায় রয়েছেন।

সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি, আর এই সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে বিজয়ী হয়েছে এবং শরিকদের নিয়ে জোটের মোট আসন দাঁড়িয়েছে ২১২ যা সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে। ফল ঘোষণায় স্থগিত থাকা দুটি আসনেও দলটির প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন।
প্রায় দুই দশক পর সরকার গঠনের এই সুযোগকে বিশ্লেষকেরা দেখছেন সংগঠন পুনর্গঠন, কৌশলগত প্রার্থী নির্বাচন এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সুসমন্বিত পরিকল্পনার ফল হিসেবে। সংখ্যার এই স্পষ্ট বার্তা শুধু নির্বাচনী জয়ই নয়, বরং নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা ও রাজনৈতিক পুনরুত্থানেরও প্রতীক হয়ে উঠেছে।

গ্রেফতার থেকে প্রবাস, আর প্রবাস থেকে প্রত্যাবর্তন তারেক রহমানের এই দীর্ঘ যাত্রা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
