এবারের অমর একুশে বই মেলায় দর্শনার্থীর উপস্থিতি থাকলেও বই বিক্রি আগের বছরের তুলনায় অনেক কম বলে জানিয়েছেন প্রকাশক ও বিক্রয়কর্মীরা। মেলার ১৭ দিন পেরিয়ে গেলেও অনেক স্টলে বিক্রি হয়নি প্রত্যাশামতো বই।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) বিকেলে মেলার একটি স্টলে বসে আক্ষেপের সুরে কথা বলছিলেন বিক্রয়কর্মী । তিনি বলেন, স্টলে সব ধরনের বই রয়েছে। কিন্তু কেনার মতো পাঠক নেই। ১৭ দিন ধরে মেলা চলছে, বিক্রি হয়েছে মাত্র দশ হাজার টাকার মতো।
প্রতিবছর বইমেলার শেষ সপ্তাহে পাঠকের ভিড়ে হাঁটতেই বেগ পেতে হতো। ছুটির দিনগুলোতে মেলায় তিল ধারণেরও জায়গা থাকত না। লেখক-পাঠকের উপস্থিতিতে মেলা হয়ে উঠত প্রাণবন্ত ও কোলাহলমুখর। কিন্তু এবারের মেলায় ছোট-বড় অনেক স্টলের বিক্রয়কর্মীদের দীর্ঘ সময় অলস বসে থাকতে দেখা গেছে। পাঠকের অপেক্ষায় থাকলেও প্রত্যাশিত বিক্রি করতে পারেনি অধিকাংশ প্রকাশনী।
মেলায় দু-একজন পাঠক বইয়ের সামনে দাঁড়ালেও বেশিরভাগই শুধু দাম জিজ্ঞেস করে চলে যাচ্ছেন, বলে মন্তব্য করে প্রকাশক কায়সার আহমেদ।
প্রতিবছর পহেলা ফেব্রুয়ারি বইমেলা শুরু হওয়ার রীতি থাকলেও এবছর জাতীয় নির্বাচনের কারণে মেলা পিছিয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি শুরু করার পরিকল্পনা ছিল। তবে রোজা শুরু হয়ে যাওয়ায় ‘পাঠকশূন্যতা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির শঙ্কা’ জানিয়ে মেলা আয়োজনের বিষয়ে আপত্তি জানান প্রকাশকরা। পরে দফায় দফায় বৈঠক, স্টল ভাড়া মওকুফসহ প্রকাশকদের বিভিন্ন দাবি মেনে নিয়ে রমজানের মধ্যেই মেলা শুরু হয়।
অন্যদিকে বিক্রি অনিশ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় অনেক প্রকাশনী এবার নতুন বই প্রকাশ করেনি। বেশিরভাগই আগের প্রকাশিত বই নতুন মলাটে এনে মেলায় প্রদর্শন করেছে।
চলতি সপ্তাহের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্যান্য বছরের তুলনায় মানুষের উপস্থিতি কম। বই উল্টেপাল্টে দেখার প্রবণতাও কম। অনেকেই ঈদের বাজার শেষে একটু ঘুরে দেখতে মেলায় আসছেন। ঈদকেন্দ্রিক অন্যান্য কেনাকাটায় ব্যস্ত থাকায় বই কেনার প্রবণতা কম দেখা যাচ্ছে।
বেশ কয়কজন পাঠক অবশ্য চলতি সময়ের সাহিত্যমান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। আসাদুজ্জমান নিবির নামে এক পাঠক এ প্রসঙ্গে বর্তমান সময়কে বাংলা সাহিত্যের করুণকাল বলে আখ্যা দিয়েছেন।
একাধিক প্রকাশকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৫টি বই বিক্রি হচ্ছে এভাবে চলতে থাকলে বিক্রয়কর্মীদের বেতন দেওয়াও দুষ্কর হয়ে যাবে তুলনামূলক ছোট প্রকাশকদের।
আহমেদ হাসিব নামের একজন জানান, গত বছরের তুলনায় এবারের বিক্রি তিন ভাগের এক ভাগেরও কম। তিনি বলেন, মানুষ শপিং করে মেলায় আসে। অন্য বছর মেলার সময় বড় কোনো কেনাকাটা থাকে না। কিন্তু এবার মানুষ অন্য জায়গায় টাকা খরচ করছে। স্টলের ডেকোরেশন ও ডিজাইনের খরচই উঠবে কি না, তা নিয়েই শঙ্কা।
ভবিষ্যতে স্টল বরাদ্দ পেতে সমস্যা না হয় এমন চিন্তা থেকে অনেকেই স্টল নিয়েছেন যদিও তাদের নতুন বই নেই। বায়ান্ন প্রকাশনীর ‘দেহবণ্টন বিষয়ক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি’ বিগত বছরে বেস্ট সেলিং হলেও এবারের চিত্র একেবারেই ভিন্ন।
ঐতিহ্য, অন্যপ্রকাশ, প্রথমা, মাওলানা ব্রাদার্স, জ্ঞানকোষ, ইউপিএল, বাতিঘর, পাঠক সমাবেশ, ইত্যাদিতে অবশ্য চিত্র কিছুটা ভিন্ন দেখা গেছে।
বইমেলায় শুধু বিক্রি নয়, পাঠকদের বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়াও একটি বড় লক্ষ্য। তবে এবছর সেই লক্ষ্য কতটা পূরণ হয়েছে সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
