অভিযোগের মধ্যেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফের পদায়ন সাবেক পিও মুছিবুল হাসানের

বিশেষ প্রতিনিধি :

5 Min Read
মুছিবুল হাসান, ছবি - সংগৃহীত।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের তিন শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত সচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মো. মুছিবুল হাসান রিপুকে ফের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ থাকায় এ সিদ্ধান্ত ঘিরে মন্ত্রণালয়ে ও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ এপ্রিল এক অফিস আদেশে তাকে নতুন করে মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয়। তবে এ পদায়নের পেছনে ‘বিশেষ আগ্রহ’ ও উচ্চপর্যায়ের সুপারিশ কাজ করেছে বলে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র দাবি করেছে।

মুছিবুল হাসান রিপু ২০০৮ সালে স্টেনো কাম টাইপিস্ট পদে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন শাখায় কাজ করতে করতে তিনি ধীরে ধীরে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেন। অভিযোগ রয়েছে, ২০১২ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর পিএসের একান্ত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি শিক্ষা প্রশাসনে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তোলেন, যা অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘১২ সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত হয়।

ক্ষমতার অপব্যবহারের অতিষ্ঠ হয়ে ২৭ ফেব্রিয়ারি ২০২৫ সালে পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায় মুছিবুল হাসান ও তার বড় আওয়ামীলীগ নেতা মনিউল হাসান মিলন এর বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় সূত্র জানায়, এতই ক্ষমতাধর ছিলেন এই মুছিবুল ঢাকা শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে চাপ প্রয়োগ করে ২০২৩ সালে নিয়ম আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে নিজ উপজেলার রাজবাড়ী ডিগ্রী কলেজের বিদ্যোৎসাহী সদস্য মনোনীত হন। যার আসল উদ্দেশ্য ছিলও নিয়োগ বাণিজ্য।

 মুছিবুল হাসান ও তার বড় আওয়ামী নেতা মইনুল হাসান (মিলন) এর বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ। ( ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫) - ছবি - সংগৃহীত।
মুছিবুল হাসান ও তার বড় আওয়ামী নেতা মনিউল হাসান মিলন এর বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ। ( ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫) – ছবি – সংগৃহীত।

এমনকি তার ভাই মিলন স্থানীয় পাটিকেলবাড়ী, করফাহাট, রাজবাড়ী, ব্যাসকাঠী, নেছারাবাদ এসব অঞ্চলে রীতিমত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদবির নিয়ে প্রকাশ্যে দেনদরবার করতেন বলেও অভিযোগ আছে।


এমন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে কেনই আবার মন্ত্রণালয়ের পদায়ন করা হল তা নিয়ে খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে শুরু হয়েছে গুঞ্জন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মুছিবুল হাসান রিপু ২০০৮ সালে ১৩তম গ্রেডের স্টেনো কাম টাইপিস্ট পদে যোগদান করেন। ২০০৯ সালে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি শাখার উপ-সচিবের টাইপিস্ট হিসেবে পদায়ন পান। সেখান থেকে তার উত্থান। ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ‘১২ সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত।

রাজবাড়ী ডিগ্রী কলেজের বিদ্যোৎসাহী সদস্য মনোনীত, ছবি – সংগৃহীত।

২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদের পিএসের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন মুছিবুল। সেখানে প্রায় ৭ বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ঢাকাসহ সারাদেশে শিক্ষা প্রশাসনে মন্ত্রী ও তার পিএসের নাম ভাঙিয়ে গড়ে তোলেন একটি বলয়। তখন থেকেই বদলি, পদায়ন, এমপিওভুক্ত করণ, অভিযোগ নিষ্পত্তিসহ এমন কোনো কর্মকান্ড নেই যার তদবির বাণিজ্য শুরু করেনি এই মুছিবুল।

আর এসব অবৈধ আয়ে ফুলে-ফেঁপে উঠেন তিনি। অবশ্য তার এ অবৈধ আয়ের ভাগ পেয়েছেন মন্ত্রীর দপ্তর থেকে শুরু করে সচিব ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও।

- Advertisement -

কাকতালীয় ভাবে দীপু মনি শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর মুছিবুলকে বদলি করা হলে মাত্র ৭ দিনের মাথায় আবার আগের পদে ফিরে আসেন। এ ঘটনায় গোটা জুড়ে তার খুঁটির জোর নিয়ে বেশ আলাপ আলোচনা শুরু হয়, এমনকি তার সিন্ডিকেটের কাছে কোণঠাসা হয়ে পরেন বড় কর্তারাও। বেপরোয়া হয়ে উঠেন তিনি, সে সময় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা বোর্ড থেকে শুরু করে গ্রামপর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও ঘুষ নিতে শুরু করেন।

দীপু মনিকে সরিয়ে ২০২৪ সালে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেয় আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু মুছিবুল বহাল থাকেন তার নিজ পদে। যদিও ৫ আগস্টের পর তাকে বদলি করা হয়।

পিতার নামে মাস্টার শাহাদাৎ হোসেন পাঠাগারের নানা আয়োজন।

শুধু তদবির বাণিজ্যে আটকে থাকেনি মুছিবুলের কর্মকাণ্ড। নিজ এলাকা পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার এগারোগ্রাম সম্মিলনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রভাব খাটিয়ে তার ভাই মনিউল হাসানকে সভাপতির পদে বসান এবং ১০ বছর সেই পদে টিকিয়ে রাখেন।

- Advertisement -

অন্যদিকে মনিউল হাসান মিলন অর্থ ও প্রভাব দিয়ে নেছারাবাদে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের রাজনৈতিক কাণ্ডারি হয়ে ওঠেন।

 

সেকারণে ১০ বছর সভাপতি থেকে সকল নিয়োগ বাণিজ্য ও স্কুলের ফান্ড তসরুফের ঘটনার অভিযোগের একটিও আলোর মুখ দেখেনি।

মনিউল হাসান মিলন, ছবি – সংগৃহীত। 

পিতার নামে মাস্টার শাহাদাৎ হোসেন পাঠাগার নির্মাণ করে দুই ভাই, গ্রামে যার দায়িত্বে ছিলেন মিলন। নানা সামাজিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা করে যেখানে লক্ষ লক্ষ টাকার পুরস্কার দিতেন দুই ভাই। যদিও অভিযোগ আছে মুছিবুল হাসান স্থানীয় নাজমুল ফকিরের পৈতৃক জায়গা জোর পূর্বক লিখে নিয়ে পাঠাগারের অফিস নির্মাণ করেন।

অভিযোগের বিষয়ে মুছিবুল হাসান বলেন, স্যারের নিয়ে এসেছে, আমি আর কী বলব। পাহাড় সমান দুর্নীতির কথাও তিনি অস্বীকার করেন।

বড় ভাই মনিউল হাসান মিলন অভিযোগের বিষয়ে বলেন, পারিবারিক দ্বন্ধে বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলে, ছোট ভাইয়ের অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে তিনি কিছুই জানেনে না বলে জানান।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *