পেট্রোডলার কী, জ্বালানি বাণিজ্যে দ্বিমুদ্রা ব্যবস্থার বাস্তবতা কতটা?

পেট্রোডলার ব্যবস্থা এখনো বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের কেন্দ্রীয় কাঠামো। তবে বিভিন্ন দেশের বিকল্প মুদ্রায় লেনদেনের উদ্যোগ বিশ্ব অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনে পুরো ব্যবস্থার দ্রুত পরিবর্তন না হলেও আংশিক বৈচিত্র্য আরও বাড়তে পারে।

মনিরুল ইসলাম :

5 Min Read

বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো “পেট্রোডলার” ব্যবস্থা। সহজভাবে বললে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য সাধারণত মার্কিন ডলারে কেনাবেচা হওয়াকেই পেট্রোডলার ব্যবস্থা বলা হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউয়ান, ইউরো বা স্থানীয় মুদ্রায় জ্বালানি বাণিজ্যের আলোচনা আবারও জোরালো হওয়ায় এই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

পেট্রোডলার কীভাবে গড়ে ওঠে

বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৭০-এর দশকে ব্রেটন উডস ব্যবস্থার অবসানের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবসহ ওপেকভুক্ত কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়, যার মাধ্যমে তেল বাণিজ্য ডলারে পরিচালিত হতে শুরু করে।

এই ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্য কার্যত ডলারকেন্দ্রিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এর ফলে—

  • তেল ও গ্যাস কেনার জন্য দেশগুলোর বাধ্যতামূলকভাবে ডলার সংগ্রহ করতে হয়, ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে ডলারের চাহিদা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ও ধারাবাহিকভাবে তৈরি থাকে।
  • কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হিসেবে ডলার ধরে রাখতে বাধ্য হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ডলারের “রিজার্ভ কারেন্সি” অবস্থান আরও শক্তিশালী করে।
  • আন্তর্জাতিক লেনদেন, ব্যাংকিং নিষ্পত্তি ও জ্বালানি মূল্য নির্ধারণে ডলারের প্রভাব স্থায়ী কাঠামো পায়।

এই চক্রাকার চাহিদার কারণে যুক্তরাষ্ট্র শুধু বাণিজ্যিক সুবিধাই পায় না, বরং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপরও তুলনামূলকভাবে বেশি প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নীতি, সুদের হার এবং ডলার সরবরাহের সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলার সুযোগ তৈরি করে, যা দেশটির অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

ডলারের ওপর নির্ভরতা কেন গুরুত্বপূর্ণ

আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্য ডলারে হওয়ায় এর দাম ও সরবরাহ বৈশ্বিক মুদ্রানীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে— ডলার শক্তিশালী হলে তেল আমদানিকারক দেশগুলোর খরচ বাড়ে, ডলার দুর্বল হলে রপ্তানিকারক দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক দেশকে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ হিসেবে ডলার ধরে রাখতে হয়।

এ কারণে তেলনির্ভর অর্থনীতিগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে ডলার-নির্ভর কাঠামোর মধ্যেই চলতে হয়েছে।

দ্বিমুদ্রা বা বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থার চেষ্টা

- Advertisement -

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের পাশাপাশি অন্য মুদ্রা ব্যবহারের চেষ্টা করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—চীনের ইউয়ানে তেল কেনাবেচার উদ্যোগ,  রাশিয়ার ইউরো ও ইউয়ানে জ্বালানি বাণিজ্য, কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক লেনদেন,  ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রার সীমিত ব্যবহার আলোচনা।

এছাড়া ইউয়ানভিত্তিক তেল বাণিজ্য সম্প্রসারণের আলোচনা ও উদ্যোগও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

 বাস্তবে পরিবর্তন কতটা হয়েছে?

- Advertisement -

বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যে ডলারের বাইরে লেনদেনের কিছু প্রবণতা দেখা গেলেও তা এখনো মূলধারার কাঠামো বদলাতে পারেনি। কিছু দেশ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রা বা ইউয়ানে লেনদেন শুরু করলেও বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের বড় অংশ এখনো ডলারের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হচ্ছে।

এর পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত ও বাস্তব কারণ রয়েছে—

ডলারের প্রতি উচ্চ আস্থা ও স্থিতিশীলতা: দীর্ঘ সময় ধরে কম ঝুঁকির রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে ডলার বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মুদ্রা হিসেবে রয়েছে।

SWIFT ও বৈশ্বিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক: আন্তর্জাতিক লেনদেন ও ক্লিয়ারিং ব্যবস্থার বড় অংশ এখনো পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল, যা ডলারের ব্যবহারকে সহজ ও কার্যকর করে তোলে।

রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে ডলারের আধিপত্য: বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার বড় অংশ ডলারে সংরক্ষিত থাকায় আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলারের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেশি।

তেলের মূল্য নির্ধারণের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড: ব্রেন্ট ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI)সহ বৈশ্বিক বেঞ্চমার্কগুলো ডলারভিত্তিক হওয়ায় তেল বাণিজ্যের হিসাব-নিকাশও মূলত ডলারে কেন্দ্রীভূত থাকে।

ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সুবিধা: ডলার ব্যবহারে মূল্য ওঠানামার ঝুঁকি মোকাবিলা তুলনামূলক সহজ হওয়ায় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো এই মুদ্রাকে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করে।

ফলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্বিমুদ্রা বা বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থার আলোচনা বাড়লেও বাস্তব ক্ষেত্রে এটি এখনো সীমিত পর্যায়ের মধ্যে রয়েছে। মূলত কিছু দেশ রাজনৈতিক বা কৌশলগত কারণে বিকল্প লেনদেন চালু করলেও বৈশ্বিক বাজারে তার প্রভাব এখনো কাঠামোগত পরিবর্তন আনার মতো নয়।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি বাণিজ্যে মুদ্রা পরিবর্তনের বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। নিষেধাজ্ঞা, নিরাপত্তা জোট, আঞ্চলিক প্রভাব এবং বৈশ্বিক ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে কোনো একটি দেশের জন্য দ্রুত ডলার-নির্ভর কাঠামো থেকে সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে আসা কঠিন।

তবে একই সঙ্গে তারা মনে করছেন, বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে একক মুদ্রা নির্ভরতা থেকে সরে ‘মাল্টি-কারেন্সি সিস্টেম’-এর দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে ডলারের পাশাপাশি ইউয়ান, ইউরো বা আঞ্চলিক মুদ্রার ব্যবহার ধাপে ধাপে আরও দৃশ্যমান হতে পারে।

তেল বাণিজ্যে মুদ্রা পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ও। নিষেধাজ্ঞা, নিরাপত্তা জোট, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা সব মিলিয়ে কোনো একক দেশের পক্ষে দ্রুত ডলার-নির্ভরতা ভাঙা কঠিন।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *