৩ জুলাই, ১৯৭১ ফ্রান্সের প্যারিসের একটি সাধারণ অ্যাপার্টমেন্ট। সেখানেই মাত্র ২৭ বছর বয়সে শেষ হয় জিম মরিশনের জীবন। সরকারি নথিতে এটি ছিল হৃদ্রোগজনিত মৃত্যু। কিন্তু রকসংগীতের ইতিহাসে দিনটি অন্য অর্থ বহন করে। কারণ, সেদিন একজন শিল্পীর জীবন শেষ হলেও শুরু হয় এক কিংবদন্তির যাত্রা।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরও জিম মরিশন শুধু একটি নাম নন; তিনি এক সাংস্কৃতিক প্রতীক। তাঁর গান, কবিতা, ব্যক্তিত্ব এবং জীবনযাপন নিয়ে আগ্রহ আজও ফুরোয়নি। নতুন প্রজন্মের শ্রোতারাও নিয়মিত ফিরে আসেন তাঁর গানে, তাঁর লেখায় এবং তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলোর কাছে।
কবিতা থেকে রকের মঞ্চে :
১৯৪৩ সালের ৮ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মেলবোর্নে জন্ম জেমস ডগলাস মরিশনের। বাবা ছিলেন মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তা। ফলে শৈশব কেটেছে এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরে। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য, দর্শন, পুরাণ এবং ফরাসি প্রতীকবাদী কবিদের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। বিশেষ করে ফ্রিডরিখ নীটশে, আর্থার র্যাঁবো, উইলিয়াম ব্লেক ও অ্যালডাস হাক্সলির লেখার প্রভাব তাঁর ভাবনায় স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র বিভাগে পড়ার সময় তাঁর পরিচয় হয় রে ম্যানজারেকের সঙ্গে। একদিন সমুদ্রসৈকতে মরিশন নিজের লেখা একটি গান শোনান। রে পরে বলেছিলেন, তখনই তাঁর মনে হয়েছিল, এই কণ্ঠ অসাধারণ কিছু করতে পারে। সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় দ্য ডোরসের যাত্রা। পরে রবি ক্রিগার ও জন ডেনসমোর যোগ দিলে ব্যান্ডটি পূর্ণতা পায়।

‘দ্য ডোরস’: শুধু একটি ব্যান্ড নয় :
দ্য ডোরস নামটির পেছনেও রয়েছে এক দার্শনিক ভাবনা। অ্যালডাস হাক্সলির The Doors of Perception বই থেকে নেওয়া হয় নামটি। হাক্সলি আবার অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন কবি উইলিয়াম ব্লেকের বিখ্যাত পঙ্ক্তি থেকে—’If the doors of perception were cleansed, everything would appear to man as it is, infinite.’
এই দর্শনই যেন দ্য ডোরসের সংগীতকে আলাদা করে তুলেছিল। তাদের গান শুধু প্রেম কিংবা সম্পর্কের গল্প নয়; সেখানে ছিল মানুষের অবচেতন মন, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, মৃত্যু, ভয়, ক্ষমতা এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন।
১৯৬৭ সালে প্রকাশিত প্রথম অ্যালবাম The Doors রকসংগীতের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। Light My Fire গানটি ব্যান্ডটিকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তোলে। এরপর Strange Days, Waiting for the Sun, The Soft Parade, Morrison Hotel এবং L.A. Woman প্রতিটি অ্যালবামই ষাট ও সত্তরের দশকের রকসংগীতে নতুন মাত্রা যোগ করে।
People Are Strange, Break On Through (To the Other Side), The End, Riders on the storm কিংবা Roadhouse Blues এসব গান আজও বিশ্বের অসংখ্য রেডিও স্টেশন, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন সিরিজ এবং স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে সমান জনপ্রিয়।
ষাটের দশকের পাল্টে যাওয়া পৃথিবী:
জিম মরিশনের উত্থান এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, নাগরিক অধিকার আন্দোলন, হিপ্পি সংস্কৃতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের দাবিতে তরুণেরা রাস্তায় নেমেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রজন্মগত সংঘাতের সেই সময়ে দ্য ডোরসের গান হয়ে উঠেছিল এক ধরনের প্রতিবাদের ভাষা।
তাঁদের সংগীতে সরাসরি রাজনৈতিক স্লোগান কম থাকলেও ব্যক্তি স্বাধীনতা, মানসিক মুক্তি এবং সামাজিক রীতিনীতিকে প্রশ্ন করার প্রবণতা তরুণদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। ফলে জিম মরিশন হয়ে ওঠেন কেবল একজন রকতারকা নন, বরং এক সাংস্কৃতিক আইকন।

মৃত্যু, রহস্য এবং এক কিংবদন্তির জন্ম :
১৯৭১ সালে প্যারিসে চলে যান জিম মরিশন। বন্ধুদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তখন সংগীতের চাপ থেকে দূরে সরে কবিতায় মন দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ৩ জুলাই তাঁর মৃত্যু হয়। ফরাসি আইনে সে সময় ময়নাতদন্ত বাধ্যতামূলক না হওয়ায় তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে নানা জল্পনা তৈরি হয়। কেউ অতিরিক্ত মাদকের কথা বলেছেন, কেউ ষড়যন্ত্রের গল্প বলেছেন। তবে এসব দাবির কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আজও পাওয়া যায়নি।
প্যারিসে আজও এক তীর্থস্থান :
প্যারিসের বিখ্যাত পেরে লাশেজ (Père Lachaise) কবরস্থানে সমাহিত আছেন জিম মরিশন। বিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় এই কবরস্থানেই শায়িত আছেন অস্কার ওয়াইল্ড, ফ্রেদেরিক শপাঁ, এদিত পিয়াফসহ বহু বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব।
প্রতিবছর ৩ জুলাই এবং ৮ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুদিন ও জন্মদিনে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ভক্তরা মরিশনের সমাধিতে ফুল, কবিতা, গিটারের পিক কিংবা হাতে লেখা চিরকুট রেখে যান। একসময় তাঁর সমাধিতে ভক্তদের ভিড় এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে কর্তৃপক্ষ সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে বাধ্য হয়।
মৃত্যুর পরও শেষ হয়নি যাত্রা :
জিম মরিশনের মৃত্যুর দুই দশক পর, ১৯৯১ সালে পরিচালক অলিভার স্টোন নির্মাণ করেন The doors চলচ্চিত্র। সেখানে মরিশনের চরিত্রে অভিনয় করেন ভ্যাল কিলমার। চলচ্চিত্রটি নতুন প্রজন্মের কাছে আবারও পরিচিত করে তোলে দ্য ডোরসকে।
আজও অসংখ্য শিল্পী প্যাটি স্মিথ থেকে পার্ল জ্যাম, এমনকি আধুনিক অলটারনেটিভ রক ব্যান্ডগুলোর অনেকেই মরিশনকে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর কবিতাও বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
শিল্পী বেঁচে থাকেন তাঁর সৃষ্টিতে :
রকসংগীতের ইতিহাসে ‘২৭ ক্লাব’-এর সদস্য হিসেবে জিম মরিশনের নাম প্রায়ই উচ্চারিত হয়। কিন্তু তাঁর পরিচয় কেবল অকালমৃত এক রকতারকার নয়। তিনি এমন একজন শিল্পী, যিনি জনপ্রিয় সংগীতের ভেতরে কবিতা, দর্শন, নাটকীয়তা এবং অস্তিত্বের প্রশ্নকে একসঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন।
মৃত্যুর ৫৫ বছর পরও তাঁর কণ্ঠ থেমে নেই। Light My fire কিংবা Riders on the Storm বাজলেই বোঝা যায়, কিছু শিল্প সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না।
৩ জুলাই তাই শুধু একজন সংগীতশিল্পীর মৃত্যুবার্ষিকী নয়। এটি এমন এক শিল্পীকে স্মরণ করার দিন, যিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্প মানুষের উপলব্ধির নতুন দরজা খুলে দিতে পারে। সেই দরজা আজও খোলা আছে জিম মরিশনের কণ্ঠে, দ্য ডোরসের সংগীতে এবং তাঁর রেখে যাওয়া কবিতার পঙ্ক্তিতে।
