বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত খোকন আবদুল্লাহর দেশত্যাগের ঘটনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই তিনি বরিশাল ছাড়েন। এরপর কয়েক মাস দেশের বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তাঁর বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ সরিয়ে নেওয়া, সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারদের বিল পরিশোধে অনিয়মসহ নানা অভিযোগ সামনে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে খোকন আবদুল্লাহর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরগুলোতে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাইও সম্ভব হয়নি।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, সাবেক এই মেয়রের দায়িত্বকালীন বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। সংশ্লিষ্ট নথি ও লেনদেনের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
৪ আগস্ট রাতে বরিশাল ছাড়েন
স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাতে বরিশালের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে খোকন আবদুল্লাহ শহর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ওই রাতে তিনি নগরের একটি বাসা থেকে বের হন।
ঘনিষ্ঠজনদের একজনের দাবি, যাওয়ার আগে তিনি বাসায় থাকা নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার সঙ্গে নেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, টাকার পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ কোটি টাকা। তবে এই দাবির পক্ষে কোনো নথি বা স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, বরিশাল থেকে তিনি প্রথমে খুলনায় যান। সেখানে এক আত্মীয়ের বাসায় কিছুদিন অবস্থানের পর খুলনার এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার বাসায় আশ্রয় নেন।
ঠিকাদারদের বিলের চেক নিয়ে অভিযোগ
সাবেক মেয়রের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হলো, খুলনায় অবস্থান করার সময় তিনি বরিশাল সিটি করপোরেশনের কয়েকজন ঠিকাদারের পাওনা পরিশোধের চেকে স্বাক্ষর করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের কিছু কর্মকর্তা ও তাঁর তৎকালীন ব্যক্তিগত সহকারী এসব চেক তাঁর কাছে নিয়ে যান এবং স্বাক্ষরের পর আবার বরিশালে ফিরিয়ে আনেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা ঠিকাদারদের সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে, পরে যুক্তরাষ্ট্রে
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, খুলনায় অবস্থানের সময় কয়েকবার দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেন খোকন আবদুল্লাহ। পরে ২০২৪ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে সিলেটের তামাবিল সীমান্ত দিয়ে ভারতের আসামে প্রবেশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর তিনি কলকাতায় অবস্থান করেন। সেখানে কিছুদিন থাকার পর যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান বলে জানা গেছে।
তাঁর পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তাঁর ছেলের কাছে যাওয়ার পর তিনি টেক্সাসে অবস্থান করছেন। সেখানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে স্থায়ীভাবে থাকার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অর্থ পাচারের অভিযোগ
খোকন আবদুল্লাহ দেশ ছাড়ার সময় সঙ্গে নেওয়া অর্থ পরে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর অভিযোগও করেছেন তাঁর বিরোধীরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে অর্থ মালয়েশিয়া হয়ে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয় এবং পরে তা যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়। তবে এই অর্থ লেনদেনের কোনো ব্যাংক নথি বা সরকারি তদন্তের ফল এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
মেয়র থাকাকালীন কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন
খোকন আবদুল্লাহ অল্প সময়ের জন্য বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে পরে অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগকারীদের দাবি, মেয়র থাকাকালে তিনি প্রভাব খাটিয়ে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো আদালতের কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে খোকন আবদুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মুঠোফোন নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া গেছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তদন্ত সংস্থাগুলোর অনুসন্ধান শেষে অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
