বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান এএফএম শাহীনুল ইসলামের আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর থেকে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা আর্থিক খাত নতুন এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে। গভর্নরের নির্দেশে তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হলেও বাস্তবে সেই নির্দেশ উপেক্ষা করে পরদিনই তিনি অফিসে যোগ দেন। এ ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত আচরণ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা—সবকিছুরই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বনাম জনআস্থা
প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত গোপনীয়তা তার সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু রাষ্ট্রীয় আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের মতো একটি স্পর্শকাতর পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির আচরণ কেবল ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না। সামাজিক মাধ্যমে যখন এমন আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল হয়, তখন তা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করে। অর্থপাচার রোধ, আর্থিক অপরাধ শনাক্তকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যার কাঁধে, তাকে ঘিরে যদি বিতর্ক তৈরি হয় তবে গোটা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
প্রথমে রম্য নাটক ভেবেছিলাম
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে টানটান উত্তেজনা। কারণ? নগদ টাকার সংকট না, ডলারের দাম না, বরং এক নগ্ন ভিডিও। ভিডিওতে দেখা গেছে এএফএম শাহীনুল ইসলামকে। আপত্তিকর বলছে সবাই। তবে তিনি বলছেন, এটা এআই বানাইছে।
গভর্নর সাহেব একেবারে আধুনিক ঢঙে সমাধান দিলেন; যাও, বাধ্যতামূলক ছুটিতে যাও। অফিসে এসো না।
কিন্তু শাহীনুল সাহেবের যুক্তি আরও আধুনিক নগ্ন ভিডিও ফাঁস হলে অফিসে আসা যাবে না, এমন তো কোনো আইন নাই !
এমন আইন আসলেই নাই। সংবিধানে লেখা আছে নাগরিকের কাজ করার অধিকার আছে। যদিও সেখানে ‘ভিডিও ফাঁস হলে কী হবে’ এই ধারাটা বাদ গিয়েছিল। আইন কমিশন হয়তো বিষয়টা খেয়াল করেনি।
যাই হোক, বুধবার সকালে তিনি হাজির হলেন অফিসে। সহকর্মীরা চুপসে গেলেন। কেউ বলল, “স্যার, আপনার তো ছুটি।” তিনি চোখ পাকিয়ে বললেন, “কে কয়ছে? আমি তো হাইকমান্ডের নির্দেশে আসছি।”
হাইকমান্ড কে? প্রধানমন্ত্রী? সেনাপ্রধান? নাকি নিজের স্ত্রী? – কেউ জানে না।
ফলে অফিসের বাতাসে এক অদ্ভুত দৃশ্য; কোনো ফাইলে সই হচ্ছে না, কেবল কানে কানে আলোচনা— ভিডিওটা আসল নাকি এআই?, স্যারকে অফিসে ঢুকতে দিল কেন? হাইকমান্ড মানে কি ইউটিউব অ্যালগরিদম ?
বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত ডলার, রিজার্ভ আর সোনার দাম নিয়ে চিন্তিত থাকে। এবার নতুন চিন্তা: নগ্ন ভিডিও ফাঁস হলে কর্মচারীকে কীভাবে সামলাতে হয়। সম্ভবত ভবিষ্যতে সার্কুলার আসবে ‘ ভিডিও কেলেঙ্কারির পর কারও অফিসে ঢোকা নিষিদ্ধ।’ তবে সেটা কার্যকর হবে কেবল জুনিয়র ক্লার্কদের জন্য। বড়কর্তাদের জন্য থাকবে বিশেষ ধারা— হাইকমান্ড যদি অনুমতি দেয়, তবে অফিস করা যাবে।
শেষমেশ বোঝা গেল, নগ্ন ভিডিওর চেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে চেয়ারের প্রতি আসক্তি। শাহীনুল সাহেব যেন ঘোষণা দিলেন; ভিডিও আসতে পারে, সমালোচনা হতে পারে, কিন্তু চেয়ার ছাড়ব না!
প্রশাসনিক শৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ
গভর্নরের সরাসরি নির্দেশ উপেক্ষা করে অফিসে যোগদান করা কোনো ব্যক্তিগত অবস্থান নয়; এটি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সামিল। সরকারি কিংবা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মকর্তার জন্য শৃঙ্খলাবিধি মানা বাধ্যতামূলক। এখানে প্রশ্ন দাঁড়ায়—যদি গভর্নরের নির্দেশ কার্যকর না হয়, তবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার চূড়ান্ত ক্ষমতা কোথায়? এরকম পরিস্থিতি কেবল বিভ্রান্তি বাড়ায় না, বরং অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যেও দ্বিধা ও অনাস্থা সৃষ্টি করে।
হাইকমান্ডের রহস্য
শাহীনুল ইসলাম দাবি করেছেন, তিনি “হাইকমান্ডের নির্দেশে” অফিস করেছেন। কিন্তু হাইকমান্ড বলতে তিনি কাকে বুঝিয়েছেন তা স্পষ্ট নয়। যদি এর অর্থ রাজনৈতিক বা বাহ্যিক কোনো প্রভাব হয়, তবে সেটি একটি গুরুতর দৃষ্টান্ত। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার। অন্যথায়, রাজনৈতিক নির্দেশ বনাম প্রশাসনিক নির্দেশ—এই দ্বন্দ্ব প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে ভেঙে দেবে।
করণীয় :
১. সুস্পষ্ট নীতিমালা: কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারিতে জড়িত হলে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার পদ ব্যবহার বন্ধ থাকবে, এমন সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।
২. তদন্তের স্বচ্ছতা: ভিডিও সত্য বা ভুয়া তা প্রমাণ করা প্রয়োজন। প্রযুক্তিগতভাবে ভিডিওর প্রকৃত উৎস ও সম্পাদনার বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তে খতিয়ে দেখা দরকার।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা: বাংলাদেশ ব্যাংক ও এর অঙ্গসংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। হাইকমান্ডের নামে অদৃশ্য শক্তি যদি প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় হস্তক্ষেপ করে, তবে সেটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।
৪ . নৈতিক দায়বদ্ধতা: গুরুত্বপূর্ণ পদে যারা থাকবেন, তাদের জন্য আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা রক্ষার পাশাপাশি জনআস্থার বিষয়টিও অগ্রাধিকার পাবে।
বিএফআইইউ প্রধানের ভিডিওকাণ্ড একটি ব্যক্তিগত ঘটনা হলেও তা বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রতিফলন।
প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক প্রভাব, নৈতিক দায়বদ্ধতা—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবেই। এখন সময় এসেছে ব্যক্তি নয়, বরং প্রতিষ্ঠান ও নীতির মর্যাদা রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার।
মনিরুল ইসলাম, নির্বাহী সম্পাদক
