শেরপুর জেলার শ্রীবরদী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত সাব-রেজিস্ট্রার মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, ঘুষ, রাজস্ব ফাঁকি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত আবেদন করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার একেএম ফজলুল হকের আশীর্বাদে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে একই কর্মস্থলে বহাল রয়েছেন মাহফুজুর রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি অফিসকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ‘ত্রাসের রাজত্বে’ পরিণত করেছেন।
সরকারি জমি থেকে কোটি টাকার আয়
সম্প্রতি সাব-রেজিস্ট্রার মাহফুজুর রহমান অফিসের অব্যবহৃত সরকারি জমিতে জেলা প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই দলিল লেখকদের জন্য শেড নির্মাণ করান। এ কাজে জড়িত দলিল লেখকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। বিষয়টি শ্রীবরদী উপজেলা প্রশাসন জেলা প্রশাসককে চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছে।
দুদকে অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে নিউজনেক্সট শ্রীবরদী উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানা যায়, শেড নির্মাণ ইস্যুতে তারা ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। এ ছাড়া উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেন, সাব-রেজিস্ট্রার মাহফুজুর রহমানের আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে শেড নির্মাণের বিষয়টি স্থানীয়ভাবে অনেকেরই জানা।
এ বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার আনিছুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে শেরপুরে গিয়ে বক্তব্য নিতে বলেন। পরে প্রতিবেদক হোয়াটসঅ্যাপে সংশ্লিষ্ট নথি পাঠাতে চাইলে তিনি সংক্ষেপে বলেন, ‘আমার দরকার নেই’ এরপরই তিনি ফোন কেটে দেন।
সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি
অভিযোগে বলা হয়, অফিসে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন মৌজার শ্রেণি পরিবর্তন করা হচ্ছে। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। সাব-রেজিস্ট্রার নিয়মিত অফিস করেন না, সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে নিজের ইচ্ছামতো কার্যক্রম চালান।
অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ
প্রতিটি দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে সরকারি ফি’র বাইরে ২০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। হেবা ঘোষণা দলিলে সরকারি ফি বাদে ৩ হাজার টাকা এবং খারিজ ছাড়া দলিল করতে গেলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। এতে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
বিতর্কিত নিয়োগে সম্পৃক্ততা
২০২৩ সালের নভেম্বরে শ্রীবরদীতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করেই নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায়ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়। সে সময় ‘আজকের বাংলাদেশ’ পত্রিকায় এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়, যেখানে ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ ছিল। ওই নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন মাহফুজুর রহমান। অভিযোগকারীরা বলছেন, প্রকাশ্য দুর্নীতির প্রমাণ থাকার পরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পূর্ব ইতিহাস
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, শ্রীবরদী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে দীর্ঘদিন ধরে আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে ‘লাভজনক পোস্টিং’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে একই অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুর রহমান ভূঁইয়া দুদকের হাতে ঘুষের টাকাসহ হাতেনাতে ধরা পড়েছিলেন।
সম্পদের অভিযোগ
মাহফুজুর রহমান নিয়মিতভাবে লাখ লাখ টাকা ঘুষ নিজের কাছে রাখেন এবং সপ্তাহ শেষে সিন্ডিকেটের লোকজন তার বাসায় টাকা পৌঁছে দেয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ঢাকার উত্তরায় তার স্ত্রীর নামে একাধিক ফ্ল্যাট থাকার কথাও শোনা যাচ্ছে, তবে এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি দুদকের জমা হওয়া অভিযোগে বলা হয়।
জনগণের ভোগান্তি
স্থানীয়রা বলছেন, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গেলে জমি-সংক্রান্ত দলিল করতে সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয়। অনেকেই হয়রানির শিকার হয়ে দলিল সম্পন্ন না করেই ফিরে যেতে বাধ্য হন। এর ফলে সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। অভিযোগকারীরা দুদকের চেয়ারম্যান বরাবর দেওয়া চিঠিতে এই দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।
মাহফুজুর রহমানের বক্তব্য
সরকারি জমি থেকে কোটি টাকার আয় প্রসঙ্গে সাব-রেজিস্ট্রার মাহফুজুর রহমান দাবি করেন, জমিটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের, অন্য কারও নয়। তবে তিনি সরকারি জমি থেকে দুই কোটি টাকা আয় করার অভিযোগ অস্বীকার করেন। বিতর্কিত নিয়োগে সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টিকে ‘ পুরোনো ঘটনা’ বলে মন্তব্য করেন। তবে সাম্প্রতিক দুদকের নথি নিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি প্রথমে ফোন ধরেননি। পরে নিজেই ফোন করেন, প্রতিবেদক বক্তব্য চাইলে তিনি প্রশ্ন করেন, কল রেকর্ড হচ্ছে কেন? —এরপরই হঠাৎ করে ফোন কেটে দেন।
