বিএনপি সরকারের ১০০ দিন: কিছু অগ্রগতি, রয়ে গেছে বড় চ্যালেঞ্জ

বিশেষ প্রতিনিধি :

4 Min Read
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ, ফাইল ছবি।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, স্বাস্থ্য ও রাজনৈতিক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার সময় সরকারকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সামাজিক বিভাজনের মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট ও হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

বিশ্লেষকদের মতে, পাঁচ বছরের একটি সরকারের কার্যকারিতা মাত্র ১০০ দিনে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। তবে শুরুর দিকের পদক্ষেপগুলো সরকারের অগ্রাধিকার ও নীতিগত অবস্থানের একটি ধারণা দেয়।

অর্থনীতি নিয়ে মিশ্র মূল্যায়ন

সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল অর্থনীতি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাত সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়গুলো ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালুর পাশাপাশি ক্ষুদ্র কৃষকদের কিছু ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।

তবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনও দেখা যায়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণ এবং রাজস্ব ঘাটতি অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে।

অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রকৃত চিত্র আসন্ন বাজেটেই স্পষ্ট হবে। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ছাড়া অর্থনীতির মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব নয়।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হয়েছিল। তবে হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই ও সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনায় উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের সক্ষমতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে। যদিও সরকার মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এখনও দৃশ্যমান নয়।

- Advertisement -

এদিকে মাঠ পর্যায় থেকে ধীরে ধীরে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি কমানো এবং স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়াকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ।

রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা

সংসদে বিরোধী দলের উপস্থিতি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে বিতর্কের মধ্যেও সরকার এখন পর্যন্ত আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

তাদের মতে, সরকার একদিকে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

- Advertisement -

তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকারিতা এবং সাংবিধানিক সংস্কারের মতো বিষয়গুলোতে আরও স্পষ্ট পদক্ষেপের প্রত্যাশা রয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে নতুন সংকট

প্রথম ১০০ দিনে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে হামের প্রাদুর্ভাব। ইতোমধ্যে কয়েকশ মানুষের মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি ও কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

সরকারের দাবি

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মন্ত্রিসভার ১০টি বৈঠকে ৬০টি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, কৃষি খাতে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণকে সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের ইঙ্গিত মিলেছে। তবে অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দৃশ্যমান ফল পেতে আরও সময় লাগবে। আগামী বাজেট, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগ পরিস্থিতি সরকারের পরবর্তী পথচলার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠতে পারে।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *