যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন লেবার পার্টির নতুন নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের পর সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে ২০১৬ সালের পর এক দশকের মধ্যে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেল দেশটি।
বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় আসার পর কনজারভেটিভ সরকারের ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তনের সমালোচনা করেছিল লেবার পার্টি। কিন্তু ২০২৪ সালের নির্বাচনে বড় জয় পাওয়ার মাত্র দুই বছরের মাথায় জনপ্রিয়তা হারানো নিজেদের নেতাকেই সরিয়ে দিতে হলো দলটিকে।
দায়িত্ব গ্রহণ উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে বার্নহ্যাম রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেতৃত্ব পরিবর্তনের যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি ‘গভীরভাবে সচেতন’ এবং দেশের জন্য স্থিতিশীল সরকার নিশ্চিত করাই তাঁর অন্যতম অগ্রাধিকার।
ক্রমাগত জনসমর্থন কমে যাওয়া এবং দলের ভেতরে চাপ বাড়ার পর গত জুনে পদত্যাগের ঘোষণা দেন কিয়ার স্টারমার। পরে লেবার পার্টির অধিকাংশ এমপির সমর্থনে দলের নেতৃত্ব পান বার্নহ্যাম।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন স্টারমার। তাঁর নেতৃত্বে ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের অবসান ঘটে। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কনজারভেটিভদের আমলে বারবার প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের সমালোচনা করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁর দলও একই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।
২০১৬ সালের পর ব্রিটেনের সাত প্রধানমন্ত্রী
২০১৬ সালের জুনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে গণভোটের ফলাফলের পর পদত্যাগ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। ইইউতে থাকার পক্ষে প্রচারণা চালালেও ভোটে পরাজয়ের দায় নিয়ে তিনি সরে দাঁড়ান।
তাঁর উত্তরসূরি থেরেসা মে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেন। আগাম নির্বাচন ডেকে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পাশাপাশি ব্রেক্সিট চুক্তি পাস করাতে ব্যর্থ হন তিনি। ২০১৯ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে দলের ভরাডুবির পর পদত্যাগ করেন।
এরপর দায়িত্ব নেন বরিস জনসন। তাঁর সময়েই ব্রেক্সিট কার্যকর হয় এবং করোনা মহামারির মতো বড় সংকট মোকাবিলা করতে হয়। তবে একের পর এক রাজনৈতিক বিতর্ক ও কেলেঙ্কারির জেরে শেষ পর্যন্ত তাঁকেও পদ ছাড়তে হয়।
জনসনের পর প্রধানমন্ত্রী হন লিজ ট্রাস। মাত্র ৪৯ দিন দায়িত্ব পালন করে তিনি ব্রিটিশ ইতিহাসের সবচেয়ে স্বল্পমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রেকর্ড গড়েন। কর কমানোর ঘোষণাসহ তাঁর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করলে নিজ দলের সমর্থন হারিয়ে পদত্যাগ করেন।
অক্টোবর ২০২২ সালে দায়িত্ব নেন ঋষি সুনাক। প্রায় ২০ মাস দায়িত্ব পালন শেষে ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির কাছে পরাজিত হন তিনি। যদিও তাঁর সময়ে কিছুটা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসে, তবু জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট এবং দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন কিয়ার স্টারমার। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নীতির সমালোচনার জন্য প্রশংসা পেলেও দেশের ভেতরে অর্থনৈতিক চাপ, কল্যাণমূলক ব্যয় সংকোচনের পরিকল্পনা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে লেবার পার্টির খারাপ ফল তাঁকে চাপে ফেলে।
এ ছাড়া ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে পিটার ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগ এবং পরে তাঁকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েও স্টারমারের রাজনৈতিক বিচারবোধ নিয়ে সমালোচনা হয়।
স্টারমারের বিদায়ের মধ্য দিয়ে আবারও নেতৃত্ব পরিবর্তনের মুখ দেখল যুক্তরাজ্য। অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সামনে এখন অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা, দলীয় ঐক্য ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
