সরকারি নির্মাণ খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে থাকা প্রকৌশলীদের বদলির উদ্যোগ আট মাসেও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকার বাইরে বদলির জন্য তালিকাভুক্ত ৬৮ জন প্রকৌশলীর মধ্যে অধিকাংশই এখনো আগের কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গত বছরের ৩ নভেম্বর গণপূর্ত অধিদপ্তরের দীর্ঘদিন ঢাকায় কর্মরত প্রকৌশলীদের বদলির মাধ্যমে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে একটি চিঠি দেন। চিঠির সঙ্গে যুক্ত অভিযোগপত্রে দীর্ঘদিন একই দপ্তরে অবস্থান, প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গঠন, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ এবং নিম্নমানের কাজের অভিযোগ তুলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।
তবে মন্ত্রণালয়ের সেই নির্দেশনার আট মাস পরও পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ৬৮ কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র ৯ জনের বিষয়ে আংশিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে বদলি হয়েছেন মাত্র চারজন। আরও কয়েকজনকে ঢাকার মধ্যেই অন্য দপ্তরে পদায়ন করা হয়েছে। কয়েকজনের বদলির আদেশ স্থগিত হয়েছে। বাকি ৫৮ জন কর্মকর্তা আগের কর্মস্থলেই রয়েছেন।
দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে কর্মকর্তারা
গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দীর্ঘ সময় ধরে কর্মরত কয়েকজন প্রকৌশলীর বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে। সূত্র জানায়, ঢাকা গণপূর্ত উপ-বিভাগ-১-এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মুহাম্মদ আনিসুজ্জামান ২০০৭ সালে নগর গণপূর্ত বিভাগে উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকে ঢাকার বাইরে পোস্টিং পাননি। বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে বর্তমানে তিনি একই এলাকায় কর্মরত আছেন।
এ ছাড়া ২০১২ সালে তেজগাঁও ঢাকা ডিভিশন-৩-এ সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেওয়া মো. ইউনুস দীর্ঘদিন ঢাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে পদোন্নতির পর তিনি সার্কেল-১-এ কর্মরত। একইভাবে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রায়হান মিয়া প্রায় ১৫ বছর ধরে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ কর্মরত বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার কারণে কিছু কর্মকর্তার মধ্যে প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে প্রকল্পের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদার নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার এবং নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার মতো ঘটনা ঘটেছে।
অনেকের বদলি হয়নি, কেউ পেয়েছেন ঢাকার মধ্যেই পদায়ন
মন্ত্রণালয়ের তালিকায় থাকা সিভিল শাখার সাতজন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর মধ্যে কয়েকজনের বদলি কার্যকর হলেও কয়েকজন এখনো আগের পদে রয়েছেন। শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত উপ-বিভাগ-৪-এর মো. মতিউর রহমান মজুমদার এবং ঢাকা গণপূর্ত জরিপ উপ-বিভাগ-২-এর অসীম চন্দ্র স্বর্ণকারের বদলি আদেশ স্থগিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে আজিমপুর গণপূর্ত উপ-বিভাগ-২-এর মো. মিজানুর রহমান, মতিঝিল গণপূর্ত উপ-বিভাগ-২-এর মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম খান এবং গণপূর্ত রেলওয়ে ডাইভারশন উপ-বিভাগের মিহির কুমার রায়ের বদলি হয়েছে। তবে মুহাম্মদ আনিসুজ্জামান ও মো. রায়হান মিয়া এখনো আগের দায়িত্বে রয়েছেন।
সহকারী প্রকৌশলীদের তালিকাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। তালিকাভুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা বদলির পরিবর্তে পদোন্নতি পেয়েছেন। এর মধ্যে সাভারের আখতার বুলবুল আহম্মেদ, মিরপুরের শেখ মোহাম্মদ এনামুল হক, ঢাকা জোনের মো. ইউনুস আলী মোল্লা এবং পিপিসির মো. মনিরুল মোর্শেদ রয়েছেন।
এ ছাড়া ঢাকা সার্কেল-৪, ঢাকা বিভাগ-২, রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেল, প্রকল্প সার্কেল, ঢাকা জোন, মেট্রোপলিটন জোনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা এখনো আগের কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন।
উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র
৩৬ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলীর বদলির তালিকাতেও অগ্রগতি সীমিত বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে মাত্র তিনজন—মোহাম্মদ মাসুদুল হাসান, মুহাম্মদ সাইদুর রহমান ও মো. আল আমিন—ঢাকার বাইরে বদলি হয়েছেন।
অন্যদিকে কয়েকজনকে বদলি করা হলেও পরে ঢাকার মধ্যেই পুনরায় পদায়ন করা হয়েছে। ফলে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ উপ-সহকারী প্রকৌশলী এখনো ঢাকার বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কোনো সংস্থায় দীর্ঘদিন একই জায়গায় কর্মকর্তাদের অবস্থান করলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। নিয়মিত বদলি ও দায়িত্ব পরিবর্তন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাদের মতে, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে তা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিকে দুর্বল করে।
প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য
বদলি নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ফোন করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন ধরে একই জায়গায় থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে।
