রাজশাহীর পবা উপজেলার বামনশিকড় গ্রামের কৃষক মিনারুল ইসলাম স্থানীয় দুটি এনজিও—টিএমএসএস ও গাক থেকে নিয়েছিলেন সাড়ে তিন লাখ টাকা ঋণ। কিন্তু কাজকর্ম না থাকায় সেই টাকা শোধ করা সম্ভব হয়নি। কিস্তির চাপ, সংসারের টানাপোড়েন আর অপমান সহ্য করতে না পেরে গত ১৫ আগস্ট গভীর রাতে স্ত্রী ও সন্তানকে হত্যা করে নিজেও ফাঁস দেন তিনি। পাশে পড়ে থাকা চিরকুটে লেখা ছিল— “ঋণের চাপে ও খাবারের অভাবে…”
মিনারুলের এই মর্মান্তিক পরিণতি যেন পুরো রাজশাহী অঞ্চলের ভয়াবহ বাস্তবতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। ক্ষুদ্রঋণ ও সুদের কারবারের ফাঁদে বন্দি হয়ে প্রতিনিয়ত ভেঙে পড়ছে নিম্ন আয়ের অসংখ্য পরিবার।
শুধু গত কয়েক মাসেই রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে অন্তত ১১ জন আত্মহত্যা করেছেন ঋণের চাপে। মোহনপুরে আকবর শাহর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার হয়, তার স্ত্রীর নামে পাওয়া যায় ১১টি এনজিওর পাশ বই। কেশরহাটে সুদখোরদের নির্যাতনে প্রাণ হারান রিকশাচালক ফজলুর রহমান। পবার শামসুদ্দিন ছাত্রাবাসে আরেকজন আত্মহত্যা করেন। দুর্গাপুরে কৃষক রেন্টু পাইক কিস্তির টাকা জোগাড় করতে না পেরে জীবন দেন। নাটোরের লালপুরে রউফুল ইসলাম ও তার স্ত্রী ফাতেমা খাতুন একসাথে আত্মহত্যা করেন। প্রতিটি ঘটনার পেছনে একই কারণ—কিস্তির টাকা শোধ করতে না পারা।
রাজশাহীর চারঘাট ও বাঘার গ্রামগুলোতে অন্তত ২০টি পরিবার ঋণের দায়ে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে। ঋণদাতাদের চাপ আর অপমানের ভয়ে তারা এলাকায় টিকতে পারছেন না।
মানবাধিকার সংগঠন বরেন্দ্র উন্নয়ন প্রচেষ্টার পরিচালক ফয়েজুল্লাহ বলেন, “কাগজে সুদের হার ১৪ শতাংশ হলেও বাস্তবে তা প্রায় ৩০ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। আয়ের আগেই সাপ্তাহিক কিস্তি শোধ করতে হয়। ফলে দরিদ্ররা ঋণের জালে আটকা পড়ে, মুক্তির পথ আর খুঁজে পান না।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ খান মনে করেন, এনজিও কর্মীরা টার্গেট পূরণের জন্য যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ দিচ্ছেন। “অনেকেই সেই ঋণ উৎপাদনমুখী কাজে না লাগিয়ে সংসারের খরচ মেটাতে ব্যয় করেন। এরপর সাপ্তাহিক কিস্তির চাপ তাদের দিশেহারা করে তোলে,” বলেন তিনি।
ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালাতে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)-এর অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে তা মানছে না অনেক প্রতিষ্ঠান। রাজশাহীতে নিবন্ধিত এনজিও আছে এক হাজারেরও বেশি, তবে কোনগুলো ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালাচ্ছে, তার পূর্ণ তথ্য নেই। এমআরএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ ইয়াকুব হোসেন অবশ্য দাবি করেন, “যদি ঋণের টাকা সঠিকভাবে কাজে লাগানো হয়, তাহলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।”
ক্ষুদ্রঋণ: স্বপ্ন থেকে দুঃস্বপ্ন
একসময় দারিদ্র্য দূরীকরণের হাতিয়ার হিসেবে ক্ষুদ্রঋণকে স্বপ্নের আলো মনে করা হয়েছিল। কিন্তু আজ রাজশাহীতে তা পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে। আত্মহত্যা, পরিবার নিয়ে পলায়ন কিংবা নিঃস্ব হয়ে পড়া—এসব দৃশ্য নিত্যদিনের বাস্তবতায় ঠাঁই নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এনজিও কার্যক্রমের কঠোর নজরদারি, বাস্তবভিত্তিক নীতি প্রণয়ন এবং দরিদ্রদের জন্য টেকসই আয়ের পথ তৈরি না হলে ঋণের নাগপাশ থেকে মুক্তি মিলবে না। আর ততদিন পর্যন্ত রাজশাহীর মাঠে-ঘাটে আরও অনেক মিনারুল, আকবর বা রেন্টুর মতো গল্প লেখা হতে থাকবে।
