অনুমোদন ছাড়াই আদমদীঘিতে দাপটে চলছে বিএনপি নেতার ইটভাটা

সিয়াম সাদিক, উত্তরাঞ্চল ব্যুরো :

4 Min Read

বগুড়ার আদমদীঘিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই প্রকাশ্যে পরিচালিত হচ্ছে একটি ইটভাটা। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনের নাকের ডগায় দীর্ঘদিন ধরে ইট পোড়ানো ও বিক্রির কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বিএনপির এক নেতা। উপজেলার ছাতিয়ানগ্রাম ইউনিয়নের তিলোকপুর সড়কসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত ‘ডিজিএম’ নামের ওই ইটভাটাটি পরিচালনা করছেন সান্তাহার ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোতালেব হোসেন। নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে ভাটার কার্যক্রম চালানোর ফলে আশপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এদিকে উপজেলায় আরও অন্তত তিনটি ইটভাটার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ভাটাও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই অবাধে চলছে বলে দাবি স্থানীয়দের। দ্রুত ভাটাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন এলাকাবাসী।

জানা গেছে, উপজেলার ছাতিয়ানগ্রাম ইউনিয়নের শেষপ্রান্তে তিলোকপুর সড়কসংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে প্রকাশ্যে পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে ‘ডিজিএম’ নামের একটি ইটভাটা। সম্পূর্ণ গ্রামীণ পরিবেশ ও ফসলি জমির একেবারে পাশে অবস্থিত এই ইটভাটাটি পরিচালনা করছে একটি প্রভাবশালী মহল। জানা গেছে, ইটভাটাটির তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন সান্তাহার ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোতালেব হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং গোপনে বিভিন্ন দপ্তর ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন ধরে নির্বিঘ্নে এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, সংশ্লিষ্ট ইটভাটাটির কোনো ধরনের বৈধ অনুমোদন, লাইসেন্স কিংবা পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। শুধু ‘ডিজিএম’ ইটভাটাই নয় একই উপজেলায় বাবলুর ২টি, আরোয়া সহ আরও তিনটি ইটভাটার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, পরিবেশ সংরক্ষণ আইনকে প্রকাশ্যে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েই চলছে এসব ইটভাটার কার্যক্রম। এদিকে ইটভাটা থেকে নির্গত ঘন ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এলাকার পরিবেশ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আশপাশের ফসলি জমি, শুকিয়ে যাচ্ছে গাছপালা, বিফলে যাচ্ছে কৃষকদের মাসের পর মাসের পরিশ্রম। ধোঁয়ার কারণে পথচারীদের চোখে দেখা দিচ্ছে তীব্র জ্বালা-পোড়া, বাড়ছে শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিল রোগ। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা পড়ছেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। ফলে এলাকাবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে। অভিযোগ আরও গুরুতর যখন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতেও সাহস পাচ্ছেন না স্থানীয়রা। প্রতিবাদ তো দূরের কথা, ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে মুখ বুজে সব সহ্য করাই যেন তাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশজুড়ে যখন অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান জোরদার করা হয়েছে, তখন বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায় রহস্যজনকভাবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। এতে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন থাকায় প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টি এড়িয়ে চলছে। আবার অনেকের দাবি, অভিযুক্তরা স্থানীয় বিএনপি ও প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় থেকে ‘উপর মহলে তদবির’ করে বারবার অভিযান ঠেকিয়ে দিচ্ছেন। উল্লেখ্য, ২০২১ সালে মোতালেব হোসেনের ওই ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে প্রশাসন ২০ লাখ টাকা জরিমানা করে এবং চুল্লি ভেঙে দেয়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই যেন ‘অলৌকিক শক্তিতে’ পুনরায় চালু হয় ইটভাটাটি। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই অব্যাহত রয়েছে এসব অবৈধ ও পরিবেশবিধ্বংসী কার্যক্রম। এই ঘটনায় পুরো এলাকাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষক অভিযোগ করে বলেন, দিন-রাত ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়ার কারণে তাদের ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এমনকি বাড়িতে কাপড় শুকাতে দিলে ধোঁয়ার ছাই পড়ে কাপড়ও নষ্ট হচ্ছে।

এ বিষয়ে ডিজিএম ইটভাটার স্বত্বাধিকারী মোতালেব হোসেন জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওই স্থানে ব্যবসা করে আসছেন। তাঁর দাবি, পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং তা নবায়নের জন্য ইতোমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করা হয়েছে।

বগুড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মাহমুদুল হাসান জানান, এসব সংশ্লিষ্ট ইটভাটার কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে শীগ্রই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *