আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগের গল্পে যেমন ঘষলেই মিলত গুপ্তধন, বাস্তব জীবনে তেমন কোনো চেরাগ ছাড়াই কৌশলগত সরকারি পদের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠেছে এক কাস্টমস কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কাস্টমস মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেট, ঢাকার প্রমোটি সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ আতীকুজ্জামান।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যমতে, তিনি এক সময় সিপাহী থেকে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হয়ে বর্তমানে সহকারী কমিশনার পদে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, চাকরিজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি ও তাঁর পরিবারের নামে বিপুল স্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
সরকারি বেতন কাঠামো (২০১৫) অনুযায়ী একজন সহকারী কমিশনারের মাসিক আয় সাধারণত ১ থেকে ১.৫ লাখ টাকার মধ্যে সীমিত। তবে অনুসন্ধানে তাঁর ও পরিবারের নামে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৪৪০ শতাংশ বা প্রায় ৪.৪ একর জমি এবং একাধিক ফ্ল্যাট ও স্থাপনার মালিকানার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব সম্পদের আনুমানিক বাজারমূল্য ৩৫ থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সম্পদের খতিয়ান :
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ আতীকুজ্জামান ও তাঁর স্ত্রী মোছাঃ আশরাফুন্নাহারের নামে রাজধানী ঢাকা এবং বিভিন্ন জেলায় একাধিক স্থাবর সম্পদ রয়েছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ভাটারা মৌজায় ৩৭ অযুতাংশ জমিসহ একটি ফ্ল্যাট, রামপুরার বনশ্রী প্রকল্পে ১১০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট (প্লট নং ই/১১, ৯১ অযুতাংশ জমিসহ) এবং রামপুরার উলন রোডে ১৩০০ বর্গফুটের আরেকটি ফ্ল্যাট (৬০ অযুতাংশ জমিসহ)।
এছাড়া মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর মৌজায় ১১১ অযুতাংশ এবং ৫০ অযুতাংশ জমিসহ দুটি পৃথক ফ্ল্যাট রয়েছে। খিলগাঁওয়ের উত্তর মেরাদিয়া এলাকায় সাড়ে ৩ শতাংশ জমির ওপর একটি বাড়ি এবং মাতুয়াইলে সাড়ে ৫ শতাংশ জমির ওপর ১১ টিনশেড ঘর থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।
ঢাকার বাইরে শেরপুরের নকলা উপজেলার কলাপাড়া মৌজায় ২৭৭ শতাংশ ও সাড়ে ৩ শতাংশ, বাজারদী এলাকায় সাড়ে ৭ শতাংশ এবং কায়দা মৌজায় ৪০ শতাংশ জমি রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় ১১২ শতাংশ কৃষি ও অকৃষি জমির মালিকানার তথ্যও পাওয়া গেছে।
সাভারের বারো কাকার এলাকায় ৮ শতাংশ জমিও তাঁর মালিকানায় রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
পটভূমি ও পেশাগত অবস্থান
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৭৩ সালের ১ এপ্রিল জন্মগ্রহণকারী মোহাম্মদ আতীকুজ্জামান শেরপুরের নকলা উপজেলার কলাপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তাঁর পিতা মোহাম্মদ শামছুল হক ও মাতা মোছাঃ আনোয়ারা বেগম। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে তিনি ও তাঁর পরিবারের নামে এসব সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
সংবেদনশীল দপ্তর ও দায়িত্ব
কাস্টমসের এই বিভাগটি আমদানি করা পণ্যের শুল্ক মূল্য নির্ধারণ ও রাজস্ব ফাঁকি রোধে অভ্যন্তরীণ অডিট পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল শাখা হিসেবে এটি উচ্চ আর্থিক লেনদেন সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে সরাসরি জড়িত। অভিযোগ অনুযায়ী, এই ধরনের কৌশলগত পদে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল আর্থিক সুবিধা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়, যা তাঁর সম্পদ বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কাস্টমস কর্মকর্তা মোহাম্মদ আতীকুজ্জামান ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা সম্পদ-সংক্রান্ত অভিযোগের তথ্য সত্য হলে তা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন, ২০০৪-এর ২৬ ও ২৭ ধারায় তদন্তযোগ্য হতে পারে।
তাঁদের মতে, অভিযোগের ভিত্তিতে আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য, সম্পদের উৎস এবং ঘোষিত সম্পদের বাইরে কোনো সম্পদ রয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও বলেন, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের বিবরণ যথাযথভাবে দাখিল করা এবং স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক। অভিযোগের ক্ষেত্রে এসব বিধি যথাযথভাবে মানা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
এ অবস্থায় মোহাম্মদ আতীকুজ্জামান ও তাঁর পরিবারের সম্পদের উৎস, আয়কর নথি, সম্পত্তির দলিলপত্র এবং আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে একটি স্বাধীন ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে।
তাঁদের মতে, অভিযোগের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করা গেলে প্রশাসনে জবাবদিহিতা আরও সুদৃঢ় হবে।
অভিযোগের বিষয়ে কাস্টমস মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার সহকারী কমিশনার আতীকুজ্জামানের অফিসে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে ফোন করেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
