অভিযোগের অন্ত নেই তবুও শিপিং কর্পোরেশনে সুফিয়ান বহাল তবিয়তে

নিজস্ব প্রতিবেদক :

8 Min Read

বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) মহাব্যবস্থাপক (ডিপিএ অ্যান্ড সিএসও) ক্যাপ্টেন আমীর মো. আবু সুফিয়ানের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, নাবিক হয়রানি, নাবিককে মারধর, নিয়োগে অনিয়ম, বেতন বৈষম্য ও শ্রম আইন লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগ উঠলেও এখনো তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বরং তদন্ত ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরও তিনি দায়িত্বে বহাল থাকায় সংস্থার ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছে। তবে এতএত অভিযোগের মধ্যে বহাল তবিয়তে আছেন সুফিয়ান, একাধিক সূত্র বলছে নতুন পদায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও রাজনৈতিক কালেকশনে জোড় তদবিরও করছেন তিনি।

শুধু তাই নয় সোহান নামে এক নাবিককে গত বছর মারধর করেন এই সুফিয়ান। এ বিষয়ে অভিযোগের কপিও প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।

সর্বশেষ গত ৭ ডিসেম্বর ক্যাপ্টেন আমীর মো. আবু সুফিয়ানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেয় বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের সী-ম্যান্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির দাবি, অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু নিষ্পত্তি না হলে নাবিকদের অধিকার ও বিএসসির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে শঙ্কার বিষয় হচ্ছে এমন ভুরিভুরি অভিযোগ নিয়েও চলতি দায়িত্ব থেকে আবু সুফিয়ানকে ক্লোজ করে পদায়নের জন্য বোর্ডে নাম উপস্থাপন করা হয়েছে। যা শিপিং কর্পরেশনের ভেতরে ও বাইরে অস্থিরতা তৈরি করছে বলে সূত্র জানান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দাবি করেন যার নিয়োগ ও পদায়ন নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন ছিল তাঁর নাম স্থায়ি নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়াকে প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কেউই স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করেনি। লোকমুখে শুনেছিলাম ক্যাপ্টেন আমীর মো. আবু সুফিয়ানের রাজনৈতিক কানেকশন ভালো এবং সে এজন্য তদবিরও করছে, যখন তাঁর নাম দেখলাম তখন নিশ্চিত হলাম। এমন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা আর আগে এমন পজিশনে অন্তত এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করেনি। তিনি আরও বলেন, যোগ্যতার বিচারে নিয়োগ হোক, নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তির ইমেজ অন্যান্য বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তর খুঁজে দেখুক, এটুকুই আমার বা এ প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের চাওয়া।

এর আগে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সী-ম্যান্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সাতটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে ধরে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর ৩ অক্টোবর তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিতে বিএসসিকে চিঠি দেয় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিএসসি শাখা। এর ধারাবাহিকতায় ১৬ অক্টোবর বিএসসি তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে, যাদের সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়ম বহির্ভূতভাবে নাবিক নিয়োগ দিয়ে তাদের ১–২ মাস জাহাজে না পাঠিয়ে বারবার অফিসে ডেকে এনে হয়রানি করা হয়েছে। এ সময় নাবিকদের কোনো বেতন, খোরাকি কিংবা যাতায়াত ভাতা দেওয়া হয়নি। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনা ক্ষতিপূরণে তাদের নিয়োগ বাতিল করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সিবিএকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি নাবিকদের দিয়ে সি-ম্যান এমপ্লয়মেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট (SEA) স্বাক্ষর করিয়ে জাহাজে পাঠানো হয়েছে, যা শ্রম আইনের পরিপন্থি বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি সিবিএর সঙ্গে সম্পাদিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি লঙ্ঘন করে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নাবিক সিলেকশন করা হয়। এর ফলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার নিজ এলাকার কয়েকজন নাবিক বিদেশি বন্দরে পালানোর সুযোগ পেয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

সূত্র জানায়, বিএসসির স্থায়ী কর্মকর্তা ও নাবিকদের নিয়োগ না দিয়ে ব্যক্তিগত পছন্দে চুক্তিভিত্তিক অফিসার ও সাধারণ নাবিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে চুক্তিভিত্তিক অফিসারদের ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত বেতন দেওয়া হলেও স্থায়ী অফিসারদের দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ডলার। একইভাবে সাধারণ চুক্তিভিত্তিক নাবিকদের বেতন নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ডলারের মধ্যে।

আরও অভিযোগ করা হয়েছে, যেসব নাবিক কর্মকর্তার নির্দেশ অনুযায়ী অফিসে অতিরিক্ত কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দেশে বা বিদেশে অবস্থানরত জাহাজ থেকে সাইন অফ করানো হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ ‘আর্টিকেল অব এগ্রিমেন্ট’ ও এমএলসি-২০০৬ নিয়োগ বিধিমালার পরিপন্থি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

- Advertisement -

অভিযোগকারীদের মতে, এসব অনিয়মের ফলে সরকারি সংস্থা ও নাবিক উভয়ই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

অন্য একাধিক সূত্র বলছে আবু সুফিয়ানের আচরণ ঘিরে সংস্থার ভেতরে তীব্র সমালোচনা ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। চলতি বছরে বিএসসির একটি অভ্যন্তরীণ সভায় মহাব্যবস্থাপক (ডিপিএ অ্যান্ড সিএসও) ক্যাপ্টেন আমীর মো. আবু সুফিয়ান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ান এবং সিনিয়র কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে অপদস্ত করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি সংস্থার একজন পরিচালকের সঙ্গেও তিনি অশালীন আচরণ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এ ঘটনায় বিএসসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ক্যাপ্টেন সুফিয়ানের উদ্ধত আচরণে ছোট-বড় কেউই রেহাই পাচ্ছেন না। তাঁদের ভাষ্য, যখন তিনি একজন পরিচালকের সঙ্গেও অশোভন আচরণ করেন, তখন অন্য কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। তাঁর এমন আচরণের পেছনে কী ধরনের প্রভাব বা শক্তি কাজ করছে, তা নিয়েই সংস্থার ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে।

- Advertisement -

একাধিক কর্মচারীও নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেছেন, ক্যাপ্টেন আমীর মো. আবু সুফিয়ানের আচরণে কর্মকর্তা, কর্মচারী ও নাবিক—সবাই ক্ষুব্ধ। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জানা থাকলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের দাবি। বিশেষ করে স্থায়ী নাবিকদের মধ্যেও তাঁর বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও অভিযোগ রয়েছে।

এর আগে গত ২১ এপ্রিল বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সামনেই সী-ম্যান্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন ক্যাপ্টেন সুফিয়ান। সংগঠনটির নেতারা জানান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কক্ষে নাবিকদের ৩১ দফা দাবিনামা নিয়ে আলোচনা চলাকালে তিনি সেখানে প্রবেশ করে কর্কশ ভাষায় তাদের কক্ষ ছাড়ার নির্দেশ দেন। পরে কক্ষ ত্যাগের সময় তিনি তাঁদের উদ্দেশ্যে হুমকিমূলক বক্তব্য দেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

সী-ম্যান্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের দাবি, ওই ঘটনার পর তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে বন্দর থানায় অভিযোগ ও সাধারণ ডায়েরি করেছেন।

আইনমতে আবু সুফিয়ানের এমন আচরণের পরিপেক্ষিতে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (জাহাজী কর্মকর্তা) চাকুরি প্রবিধানমালা, ১৯৯৯ অনুযায়ী অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত কিংবা চাকরিচ্যুত করার বিধানও রয়েছে বলে তিনি মত দিয়েছেন।

এত কিছুর পরে দুই দফা লিখিত নোটিশ, টেলিফোন ও মৌখিক অনুরোধের পরও অভিযুক্ত আবু সুফিয়ান তদন্ত কমিটির সামনে হাজির হননি। এমনকি তদন্তের স্বার্থে গত পাঁচ বছরের ক্রু লিস্টসহ প্রয়োজনীয় নথি সরবরাহের অনুরোধেও তিনি সাড়া দেননি। এতে তদন্ত কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে বলে মত দেয় কমিটি এবং দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে।

পরবর্তী সময়ে গত ৮ জানুয়ারি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নির্দেশ দিলেও বছর পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে ক্যাপ্টেন আমীর মো. আবু সুফিয়ানের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম প্রাথমিক যাচাইয়ে কয়েকটি অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে বলে জানিয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করেছে।

সাম্প্রতিক চলতি বছরের গোটা শিপিং কর্পরেশনকে অস্থিতিশীল করতে আবু সুফিয়ান মিডিয়া ট্রাইল করে একাধিক যোগ্য কর্মকর্তাকে বিব্রত করছেন বলেন অভিযোগ এসেছে, এমনকি এর পেছনে তিনি কাড়িকাড়ি অর্থ ব্যয় করছেন বলেন অভিযোগে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের শিপিং এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করছেন আমেরিকান প্রবাসী অধ্যাপক রুহুল আনোয়ার, তারমতে আমাদের অপার সম্ভবনাকে স্বাধীনতার পর থেকেই নষ্ট করেছে ব্যক্তি স্বার্থ, তাই জাতীয় স্বার্থের দিকে তাকিয়ে ব্যক্তির দায় ও দায়িত্ব যেমন বুঝতে হবে তেমন জবাবহিদিতা নিশিচত করতে হবে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত ক্যাপ্টেন আমীর মো. আবু সুফিয়ানের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য দেননি। প্রতিষ্ঠান এমডির সাথে কথা বলে কথা বলবেন বলে জানান।

newsnextbd20
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *