মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। গত এক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-এর সঙ্গে ইরান-এর সংঘর্ষ আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে উভয় পক্ষই ব্যাপক সামরিক শক্তি প্রয়োগ করলেও এখনো কোনো পক্ষই সুস্পষ্ট বিজয় অর্জন করতে পারেনি।
সংঘাতের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের কয়েকজন নিহত হন। এর জবাবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর পাশাপাশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে অবরুদ্ধ করে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে। ইরানের নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করে।
যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে আরও তীব্র হয়। ইরানের গ্যাসক্ষেত্র ও শিল্প স্থাপনায় হামলার জবাবে ইরানও আঞ্চলিক জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হানে। এতে কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
চতুর্থ সপ্তাহে যুদ্ধবিরতির চেষ্টা হলেও তা সফল হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হলেও ইরান তা প্রত্যাখ্যান করে। ফলে সংঘাত একটি অচলাবস্থার দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সামরিক কৌশলের দিক থেকে উভয় পক্ষের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর আকাশ হামলা চালিয়ে সামরিক স্থাপনা ধ্বংসে মনোযোগী। অন্যদিকে, ইরান কম খরচে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরির কৌশল গ্রহণ করেছে।
এই সংঘাতের মানবিক প্রভাবও ভয়াবহ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যমতে, ইরানে প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, আর লেবাননে প্রাণহানির পাশাপাশি লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) এ পরিস্থিতিকে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ব্যয় বৃদ্ধি এবং জনঅসন্তোষ বাড়ছে, যা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তিগুলোও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অনেক দেশ সরাসরি সংঘাতে জড়াতে না চাইলেও যুদ্ধের প্রভাব তাদের অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় পড়ছে।
