২০২২ সালের এপ্রিলে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকট বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শূন্যে নেমে যাওয়া, জ্বালানি ঘাটতি, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে পাম্পে জ্বালানি সংগ্রহ এবং খাদ্য ও নিত্যপণ্যের চরম সংকট—সব মিলিয়ে দেশটিকে তখন ‘দেউলিয়া রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
মাত্র কয়েক বছর পর সেই শ্রীলঙ্কাই এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর এক নজির হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থার সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেশটিকে আবারও উচ্চ-মধ্যম আয়ের অর্থনীতির তালিকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কার, আন্তর্জাতিক ঋণ পুনর্গঠন এবং পর্যটন ও প্রবাসী আয় পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কা ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে ফিরেছে। ২০২৫ সালে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছেছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংকটের সূচনা ও পতনের কারণ
২০১৯ সালের পর থেকে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে একাধিক নীতিগত ভুল, কর হ্রাস, বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিনির্ভরতা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় চাপ সৃষ্টি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কোভিড-১৯ মহামারি ও পর্যটন খাতের ধস। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে ২০২২ সালে দেশটি কার্যত দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়।
আইএমএফের কর্মসূচি ও সংস্কার
সংকট মোকাবিলায় শ্রীলঙ্কা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচিতে যায়। ৩ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার বিনিময়ে কঠোর শর্ত মানতে হয় দেশটিকে। এর মধ্যে ছিল কর সংস্কার, ভর্তুকি প্রত্যাহার এবং মুদ্রানীতির কঠোরতা। রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় হলেও এসব পদক্ষেপ ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আয় বাড়াতে সহায়তা করে।
নীতির ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক পরিবর্তন
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও নতুন সরকার পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক সংস্কার অব্যাহত রাখে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাবাহিকতাই শ্রীলঙ্কার পুনরুদ্ধারের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
ঋণ পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিক সহায়তা
চীনসহ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও বেসরকারি ঋণদাতাদের সঙ্গে ১৭.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পুনর্গঠন চুক্তি দেশটিকে স্বস্তি দেয়। পাশাপাশি ভারতসহ বিভিন্ন দেশ জরুরি আর্থিক সহায়তা প্রদান করে, যা সংকটকালে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখে।
পর্যটন ও রেমিট্যান্সে পুনরুদ্ধার
পর্যটন খাত পুনরায় চালু হওয়ার পাশাপাশি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে আমদানি ও চলতি হিসাব পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়।
আসন্ন চ্যালেঞ্জ
তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, ২০২৭ সাল থেকে স্থগিত বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ শুরু হলে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি নতুন চাপের মুখে পড়বে। তখন টেকসই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীল অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীলতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রীলঙ্কার এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া থেকে স্পষ্ট শিক্ষা হলো—অর্থনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হলেও এর জন্য প্রয়োজন কঠোর সংস্কার, নীতির ধারাবাহিকতা এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য।
তিন বছরের ব্যবধানে ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানো শ্রীলঙ্কা এখন বিশ্ব অর্থনীতির কাছে এক বাস্তব উদাহরণ—যেখানে ভুল সিদ্ধান্ত যেমন পতনের কারণ হয়েছে, তেমনি সঠিক নীতি পুনরুদ্ধারের পথও তৈরি করেছে।
